বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ২নং চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদ আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (ডিডিএলজি) এস.এম মনজুরুল হক। পরিদর্শনকালে নাগরিক সেবা প্রদানে অনিয়ম ও সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) দুপুরে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে তিনি প্রথমেই সেবা নিতে আসা সাধারণ নাগরিকদের সাথে কথা বলেন। সেবাগ্রহীতাদের কাছে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবার বিবরণ এবং তার বিনিময়ে পরিষদের নেওয়া ফি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে সেবাগ্রহীতারা জানান, সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়েও দ্বিগুণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বিষয়টি জানার সাথে সাথে উপ-পরিচালক ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও উদ্যোক্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তিনি অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতাদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং ভবিষ্যতে যেকোনো ধরণের জনহয়রানি বন্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দেন।
সচিবের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উপ-পরিচালক বলেন—
“সচিব ও উদ্যোক্তার মধ্যে অশুভ যোগসাজশ না থাকলে উদ্যোক্তার পক্ষে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা সম্ভব নয়। উদ্যোক্তা সরকারের কোনো স্থায়ী প্রতিনিধি নন; তিনি সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবেন। উদ্যোক্তা অনিয়ম করলে আপনারা ব্যবস্থা নেননি কেন? এভাবে জনগণ হয়রানির শিকার হলে ইউপি সচিবসহ পুরো পরিষদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে।”
পরিদর্শনকালে নাগরিকত্ব সনদের বিষয়ে উপস্থিত সেবাগ্রহীতারা সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, আগে হাতে লেখা সনদ বিনামূল্যে মিললেও এখন কোনো ঝামেলা ছাড়াই ৫০ টাকার বিনিময়ে ডিজিটাল সনদ পাওয়া যাচ্ছে। তবে জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য সেবায় চরম হয়রানির চিত্র উঠে আসে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করে বলেন, জন্মনিবন্ধনে সরকারি ফির চেয়ে অনেক বেশি টাকা নেওয়া হয় এবং স্মারক নম্বর বসানোর অজুহাতে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সচিব জানান, ইউপি চেয়ারম্যানের ‘মৌখিক আদেশে’ এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে এর সপক্ষে কোনো রেজুলেশন বা লিখিত অনুমোদন তিনি দেখাতে পারেননি। এর জবাবে উপ-পরিচালক সাফ জানিয়ে দেন।কোনো মৌখিক আদেশে জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যাবে না। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে নিয়ম মেনে পরিষদের মিটিংয়ে রেজুলেশন পাস করতে হবে
সিটিজেন চার্টার অনুপস্থিতি ও শোকজের নির্দেশ:পরিষদে সিটিজেন চার্টার (সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি) না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপ-পরিচালক। উন্নয়ন কাজের জন্য চার্টার সরিয়ে রাখা হয়েছে—সচিবের এমন জবাবে তিনি বলেন, “এটি জনভোগান্তির অন্যতম প্রধান কারণ। সাধারণ মানুষ ফি ও সেবার নিয়ম জানতে পারছে না। দ্রুত দৃশ্যমান স্থানে সিটিজেন চার্টার টাঙানোর ব্যবস্থা করুন।” একই সাথে জনহয়রানির অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) জারির জন্য আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন বলে জানান।
গ্রাম পুলিশদের আশ্বাস ও সার্বিক নির্দেশনা:পরিদর্শনের শেষভাগে উপ-পরিচালক দায়িত্বরত গ্রাম পুলিশদের সার্বিক খোঁজখবর নেন। তাদের পেশাগত মানোন্নয়নে অফিশিয়াল ইউনিফর্ম, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল বরাদ্দের আশ্বাস দেন। এ লক্ষ্যে দ্রুত তালিকা উপজেলায় পাঠানোর জন্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিশেষে তিনি পরিষদের সার্বিক কার্যক্রম, অবকাঠামো ও ভূমির নথিপত্র যথাযথভাবে হালনাগাদ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।