নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একসময় ছিল দেশের বৃহৎ পাটশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। আদমজী জুট মিলকে ঘিরে যে বিশাল শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই একই ভূমি আজ দেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচয় পেয়েছে। পুরোনো পাটকলের জায়গায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনস্থ আদমজী ইপিজেড এখন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানে ধারাবাহিক সাফল্য দেখিয়ে চলেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আদমজী ইপিজেডের বার্ষিক রপ্তানি টানা দ্বিতীয় অর্থবছরের মতো ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখান থেকে রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ইপিজেডটির রপ্তানি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হওয়ার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
বেপজার তথ্য বলছে, আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে ৪৭টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কর্মরত রয়েছেন ৭৬ হাজার ২৭ জন। অর্থাৎ একটি ইপিজেড হিসেবে এটি এখন শুধু রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেই নয়, বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২৯২ একর আয়তনের এই শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৮৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত আদমজী ইপিজেড থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছে মোট ১১ দশমিক ১১২ বিলিয়ন ডলারের। দীর্ঘ সময়ের এই রপ্তানি কার্যক্রম নারায়ণগঞ্জকে দেশের শিল্প ও রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে পরিণত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আদমজী ইপিজেডের বর্তমান রপ্তানি সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ প্রকল্পটি শুরুর সময় এর সম্ভাব্য রপ্তানি নিয়ে যে হিসাব করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবে ইপিজেডটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়ে বর্তমানে বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান জানিয়েছেন, টানা দ্বিতীয় অর্থবছরের মতো ইপিজেডটির রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্ণ হওয়ার আগেই ইপিজেডটি প্রকল্প প্রস্তাবে নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছে।
বর্তমানে ইপিজেড এলাকায় আরও ১০টি কারখানা নির্মাণাধীন রয়েছে। এসব কারখানা উৎপাদনে গেলে রপ্তানি আয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বেপজার প্রত্যাশা অনুযায়ী, নতুন কারখানাগুলো পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে গেলে আদমজী ইপিজেডের বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যেখানে ৭৬ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি কর্মরত, সেখানে নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে গেলে সরাসরি কর্মসংস্থান ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ পরিবহন, সরবরাহ, খাবার, আবাসন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য সেবা খাতের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আদমজী ইপিজেডের কারখানাগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের ধরনও ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ব্রাইডাল পোশাক, সেফটি ফুটওয়্যার, সেফটি ইকুইপমেন্ট, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পণ্য। ফলে ইপিজেডটির রপ্তানি শুধু প্রচলিত পোশাকনির্ভর থাকছে না; বরং উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পণ্যের বাজারেও বিস্তৃত হচ্ছে।
এখানকার উৎপাদিত পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন পরিচিত ব্র্যান্ডের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল করস ও ভ্যান হিউসেনের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি হচ্ছে আদমজী ইপিজেডের বিভিন্ন কারখানায়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে ফুটওয়্যার, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অটোমোটিভ পণ্য।
আদমজী ইপিজেডের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে এর অতীতের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৫০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী পরিবার প্রতিষ্ঠা করে আদমজী জুট মিলস। পরবর্তী সময়ে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ১ হাজার একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বিশাল এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল শ্রমিক আবাসন, বাজার, স্কুলসহ একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পাঞ্চল।
স্বাধীনতার পর আদমজী জুট মিল জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে নেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক লোকসান, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পুরোনো প্রযুক্তি এবং শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা সমস্যায় প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়ে। দীর্ঘদিন লোকসানের পর ২০০২ সালের ৩০ জুন ঐতিহাসিক আদমজী জুট মিলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় মিলটিতে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
একটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশাল শিল্পভূমির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরিত্যক্ত জমিকে আবার শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০০৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর জমিটি বেপজার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী ইপিজেড উদ্বোধন করা হয়।
শুরুতে অবশ্য বর্তমান সাফল্যের কোনো আভাসই ছিল না। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। ধীরে ধীরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে থাকে, গড়ে উঠতে থাকে নতুন নতুন কারখানা এবং বাড়তে থাকে উৎপাদন ও রপ্তানি।
দুই দশকেরও কম সময়ে সেই ছোট পরিসরের ইপিজেড আজ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বার্ষিক রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে। একই জমিতে বর্তমানে ৪৭টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৭৬ হাজারের বেশি মানুষের।
আদমজী ইপিজেডের অবস্থানও এর সাফল্যের অন্যতম কারণ। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান, রাজধানীর কাছাকাছি থাকা, ভালো সড়ক যোগাযোগ এবং শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। নারায়ণগঞ্জের শিল্পসমৃদ্ধ পরিবেশ এবং দক্ষ শ্রমিকের সহজলভ্যতাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে।
তবে নতুন বিনিয়োগের চাহিদা থাকলেও একটি বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ইপিজেডের সব প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে গেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য জায়গা তৈরি করতে ইপিজেড সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও শিল্পকারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদমজী ইপিজেড নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, পরিবহন খাতের ব্যস্ততা এবং শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সেবা খাতের বিকাশ—সব মিলিয়ে ইপিজেডকে ঘিরে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।
একসময় যে শিল্পভূমি বন্ধ হয়ে গিয়ে পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আজ সেই একই জায়গা আবার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করছে এবং দেশের অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি অবদান রাখছে। আদমজী জুট মিলের ইতিহাস যেমন বাংলাদেশের শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তেমনি আদমজী ইপিজেডের বর্তমান সাফল্যও পুরোনো শিল্পভূমিকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে গেলে এই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আদমজী ইপিজেড ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের আরও বড় কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারে।