বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর প্রায় একই সময় রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু আজ সিঙ্গাপুর উন্নয়ন, সুশাসন ও নাগরিক মর্যাদার এক বৈশ্বিক মডেল, আর বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। এই ব্যবধানের পেছনে মূল কারণ রাজনৈতিক পরিকল্পনা, নেতৃত্বের মান এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে—দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, যোগ্য নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াও একটি রাষ্ট্র বিশ্বসেরা হতে পারে। অথচ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অযোগ্য আইনপ্রণেতা ও খণ্ডিত উন্নয়ন ভাবনা রাষ্ট্রকে পিছিয়ে রেখেছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে করুণ প্রতিফলন দেখা যায় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবনে। আধুনিক শহর, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের পেছনে যাদের শ্রম, তারাই সবচেয়ে অবহেলিত। কষ্টকর কাজ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, গাদাগাদি করে বসবাস এবং অনেক ক্ষেত্রে রূঢ় ও উগ্র আচরণের শিকার হওয়া—এই বাস্তবতা আমাদের রাষ্ট্রীয় দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ শক্ত রাষ্ট্র ছাড়া প্রবাসে নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে হোটেল শেরাটনে জামায়াত আমিরের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের যে আলোচনা ও পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয়েছে, তা রাজনৈতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। সেখানে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, নৈতিক নেতৃত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের যে রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে—তা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে: দেশ পরিচালনার জন্য তারা একটি কাঠামোবদ্ধ পরিকল্পনা সামনে আনতে চাইছে।
কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থেই এখানেই আলোচনা থেমে থাকা উচিত নয়। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপিরও একইভাবে সুস্পষ্ট, তথ্যভিত্তিক ও সময়োপযোগী রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। শুধু ক্ষমতায় গেলে কী করবেন—এই সাধারণ বক্তব্য নয়; বরং অর্থনীতি, সুশাসন, দুর্নীতি দমন, প্রবাসী শ্রমিক সুরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে তাদের রূপরেখা কী—তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
কারণ জাতির জন্য প্রকৃত লাভ তখনই হবে, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যক্তি আক্রমণ নয়—পরিকল্পনার প্রতিযোগিতা হবে। সিঙ্গাপুর এগিয়েছে এই কারণেই যে, সেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে “কীভাবে দেশ এগোবে”—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রবাসে শ্রমিকের লাঞ্ছনা, দেশে বেকারত্ব, দুর্নীতি ও আস্থাহীনতা—সবকিছুর উত্তর একটাই: সুশাসনভিত্তিক, বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পনা আলোচনায় এসেছে—এটি একটি দিক। এখন জাতির প্রত্যাশা, বিএনপিসহ অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক শক্তিও তাদের বিকল্প ও প্রতিদ্বন্দ্বী উন্নয়ন পরিকল্পনা জনসমক্ষে আনবে।
কারণ উন্নয়ন মানে শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়—উন্নয়ন মানে যোগ্যতা প্রমাণ করা। আর পরিকল্পনার তুলনামূলক বিচারেই জাতি বুঝতে পারবে—কার হাতে বাংলাদেশ বেশি নিরাপদ, বেশি মর্যাদাবান ও বেশি সম্ভাবনাময়।