ভোরের আলো ফুটতেই কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড এলাকা। রাতের নীরবতা ভেঙে হাজারো মানুষের পদচারণা আর যানবাহনের শব্দে জেগে ওঠে পুরো জনপদ। কেউ ছুটছেন কর্মস্থলে, কেউ কারখানায়, কেউবা জীবিকার প্রয়োজনে বেরিয়ে পড়েছেন ঘর থেকে।
ঘড়ির কাঁটা যখন ভোর ৬টার কাছাকাছি, তখনই সড়কে বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, অটোরিকশা, মিশুক ও বিভিন্ন মালবাহী যানবাহনের চাপে ব্যস্ত হয়ে ওঠে আদমজী ইপিজেডের আশপাশের সড়ক। কখনো কখনো সেই ব্যস্ততা রূপ নেয় দীর্ঘ যানজটে। কর্মস্থলমুখী মানুষের সময় নষ্ট হয়, বাড়ে ভোগান্তি।
আর এই ব্যস্ততার মাঝেই প্রতিদিন দেখা যায় এক তরুণ মাশরাফি কে – যখন অন্যরা যানজট এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, তখন মাশরাফির যানজটের মাঝেই দাঁড়িয়ে থাকেন। মানুষের চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক রাখতে নিজের মতো করে চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।প্রচণ্ড রোদ কিংবা বৃষ্টি কোনো কিছুই যেন তার পথ আটকাতে পারে না। কখনো একদিকে গাড়ি থামিয়ে অন্যদিকের যানবাহনকে চলার সুযোগ করে দেন, আবার কখনো ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় যানবাহনকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করেন।
তার নেই কোনো নির্দিষ্ট অফিস, নেই নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নেই মাস শেষে নিশ্চিত বেতনের নিশ্চয়তা। আছে শুধু জীবিকার তাগিদ আর মানুষের চলাচল সহজ করার চেষ্টা।জীবন কখনো মসৃণ পথ নয় কখনো সেখানে ধুলো, কখনো কাঁটা, আবার কখনো অজানা মোড়। মাশরাফির জীবনও যেন সেই পথেরই এক চলমান গল্প।মানুষ খুশি হয়ে কেউ তাকে ২০ টাকা দেন, কেউ ৫০ টাকা, আবার কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী ১০০ টাকা দিয়ে উৎসাহিত করেন। কারও কাছে এই অর্থ হয়তো সামান্য। কিন্তু মাশরাফির কাছে প্রতিটি টাকা তার পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দিন শেষে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এই অর্থ দিয়েই চলে তার সংসার। আয় নিশ্চিত নয়, কিন্তু দায়িত্ব নিশ্চিত। তাই প্রতিদিন নতুন আশায় সকালে বেরিয়ে পড়েন তিনি।দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তার সেই জীবনসংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমিত আয়ে সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই।
কারণ ঘরে ফেরার সময় তার অপেক্ষায় থাকে পরিবার। সেই পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতেই প্রতিদিন আবার রাস্তায় নামতে হয় তাকে।হয়তো তার স্বপ্নের আকাশ খুব বড় নয়; কিন্তু পরিবারের জন্য তার দায়িত্বের আকাশ অনেক বড়।সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ব্যস্ত সড়কে শারিফ এর ছোটাছুটি হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতায় লেখা থাকে না। তার পরিশ্রমের জন্য হয়তো কোনো পদক নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। কিন্তু প্রতিদিনের নগরজীবনে তার মতো মানুষের শ্রম নীরবে অনেকের পথকে সহজ করে দেয়।
শহর আসলে শুধু ইট-পাথরের তৈরি নয়। শহর গড়ে ওঠে মানুষের ঘাম, শ্রম আর স্বপ্নে। কেউ কারখানায় কাজ করেন, কেউ গাড়ি চালান, কেউ দোকানে বসেন, আবার কেউ ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন।
শারিফ ও সেই নীরব শ্রমজীবী মানুষের একজন।সকাল থেকে সন্ধ্যা আদমজী ইপিজেডের ব্যস্ত সড়কে তার ছুটে চলা যেন জীবনের সঙ্গে এক অবিরাম দৌড়। দিন শেষে হয়তো ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরেন, হাতে থাকে অল্প কিছু টাকা। কিন্তু সেই অল্প টাকার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প।
সূর্য ডুবে যায়, সড়কের কোলাহল কমে আসে; কিন্তু মাশরাফির জীবনের সংগ্রাম থামে না। কারণ পরদিন আবার ভোর হবে, আবার মানুষ ছুটবে কর্মস্থলে, আবার আদমজী ইপিজেডের সড়কে তৈরি হবে যানবাহনের চাপ—আর সেই ভিড়ের মাঝেই আবার দেখা যাবে শারিফকে।
মানুষের পথ একটু সহজ করা আর নিজের পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার আশায় প্রতিদিন তিনি ছুটে চলেন।মাশরাফির এই ছুটে চলা তাই শুধু যানজট সামলানোর গল্প নয়; এটি একজন তরুণের জীবনসংগ্রাম, দায়িত্ববোধ ও বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের গল্প।