বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশ মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু-কিশোর। দীর্ঘস্থায়ী এই বাস্তুচ্যুতির কারণে এসব শিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ না পেলে একটি পুরো প্রজন্ম পিছিয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (UNHCR) বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজসেন।
সম্প্রতি ‘টক টু আল জাজিরা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন ইভো ফ্রেইজসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; এটি তাদের জন্য আশা, সহনশীলতা এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তার মতে, শিক্ষা শিশুদের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিস্থিতি তৈরি হলে এসব শিশু যাতে নিজেদের সমাজ ও দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, সে প্রস্তুতিও শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব।
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা শিশুদের একটি বড় অংশ নিজেদের মাতৃভূমি মিয়ানমার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়াই বড় হচ্ছে। তাদের শৈশব কাটছে শরণার্থী শিবিরের সীমাবদ্ধ পরিবেশে। ফলে শিক্ষার পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ইভো ফ্রেইজসেন সতর্ক করে বলেন, শিক্ষার সুযোগ না থাকলে একটি পুরো প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শিক্ষা থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকা শিশুদের ভবিষ্যতে দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং নিজেদের জীবনকে স্বাবলম্বী করার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ তৈরি এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে।
রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামোর মধ্যে তাদের মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান। তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংকট দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাবঞ্চিত রেখে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় বসে থাকা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। বরং প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এতে শিশুরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হলে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ শিক্ষিত ও দক্ষ একটি প্রজন্ম নিজ দেশে ফিরে গেলে সমাজ পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে।
ইভো ফ্রেইজসেনের বক্তব্যে তাই রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি শুধু মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে কোনো শিশুই যেন ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের’ অংশ না হয়—এখন সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।