চিকিৎসার শেষ ভরসা হিসেবে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ছুটে আসেন। কেউ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন, আবার কেউ হাসপাতালের বেডেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে রোগমুক্তি কিংবা প্রিয়জন হারানোর বেদনার মধ্যেও অনেক পরিবারকে পড়তে হচ্ছে আরেক নতুন সংকটে—অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে চরম হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রামেক হাসপাতালকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে অ্যাম্বুলেন্স পরিবহন ব্যবস্থার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ভাড়া উপেক্ষা করে দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত অর্থ আদায়, বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা এবং মরদেহ পরিবহনকে কেন্দ্র করে অঘোষিত আধিপত্য বিস্তার করে আসছে এই সিন্ডিকেট।
একাধিক সূত্র জানায়, মাত্র ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি পুরো হাসপাতাল এলাকার অ্যাম্বুলেন্স কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের মধ্যে একজনের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে অন্তত ১১টি অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতাল চত্বর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এই গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার থাকায় বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স সহজে প্রবেশ করতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি রোগীর স্বজনরা পরিচিত বা কম ভাড়ার গাড়ি আনতে চাইলেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। রামেকের নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৩৫ টাকা এবং এর বেশি দূরত্বে ৩০ টাকা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই হার উপেক্ষা করে রোগী ও মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। শোকাহত পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধ করছেন।
সূত্র বলছে, হাসপাতালে কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটলেই সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড বা অন্যান্য মাধ্যমে দ্রুত সেই তথ্য পৌঁছে যায় সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে। এরপর তারা মৃত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ব্যবহারে চাপ প্রয়োগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের পছন্দমতো গাড়ি নির্বাচন করার সুযোগও থাকে না। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে রামেকে ৪৯০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এসব মরদেহ পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্ধশতাধিক লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। অভিযোগ রয়েছে, এই পরিবহন ব্যবস্থাকে ঘিরে নিয়মিত কমিশনভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সিন্ডিকেটের অন্যতম অভিযুক্ত সুমন দাবি করেন, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া স্বাভাবিক রয়েছে এবং রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারিত নয়। তার ভাষায়, “যে যার মতো ভাড়া নিয়ে থাকে। এখানে সিন্ডিকেট বলে কিছু নেই।”
একই সুরে কথা বলেন চক্রের আরেক সদস্য। তার দাবি, ভাড়া পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় এবং কাউকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয় না।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। সিরাজগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন আব্দুল্লাহ আল মামুন অভিযোগ করেন, অসুস্থ বাবাকে যে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে আনা হয়েছিল, মৃত্যুর পর সেই একই গাড়িতে মরদেহ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। স্থানীয় সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া মরদেহ পরিবহন সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। পরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহ পরিবহনের জন্য কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নেই। এই সুযোগকে কেন্দ্র করেই বেসরকারি মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের বাইরে থেকে কোনো মরদেহবাহী গাড়ি এলেও সেখান থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় করা হয়। ফলে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আশরাফ জানান, প্রায় এক মাস আগে তার এক ভাতিজা রামেকে মারা যান। মরদেহ বাড়িতে নিতে প্রথমে ২০ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করা হয়। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে ১৩ হাজার টাকায় গাড়ি ভাড়া করতে সক্ষম হন। তার অভিযোগ, মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করেই এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
এমন অভিযোগ একক কোনো ঘটনার নয়। বহু রোগী ও স্বজন জানিয়েছেন, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা নেই। পরিস্থিতি, দূরত্ব এবং যাত্রীর অসহায় অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। বিশেষ করে শোকাহত পরিবারগুলো তখন বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার মতো অবস্থায় থাকেন না।
স্থানীয়দের মতে, সময়ভেদে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকেন। ফলে অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
এদিকে, অতীতেও এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নিয়েছিল হাসপাতাল প্রশাসন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এফ এম শামীম আহম্মদ বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভাগীয় কমিশনার, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং র্যাব-৫-এর অধিনায়কের কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছিলেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসব উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, নির্ধারিত ভাড়া কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, হাসপাতাল এলাকায় ডিজিটাল ভাড়া তালিকা প্রদর্শন, সরকারি মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স চালু, বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিতকরণ এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হেল্পডেস্ক চালুর মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট সংক্রান্ত অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।