1. [email protected] : Ghoshana Desk :
  2. [email protected] : Mahir Al Mahbub : Mahir Al Mahbub
  3. [email protected] : Masud Khan : Masud Khan
যখন পুলিশের নাম শুনেই ভয় পায় মানুষ - দৈনিক ঘোষণা
ব্রেকিং নিউজ :
নন্দিনী হত্যার বিচার হবে খুব দ্রুত পরিবারের পাশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী দুলু ভালোবেসে বিয়ে, দাম্পত্য কলহে বিয়ের ৮ মাস পরই রহস্যজনক মৃত্যু নিবিরের মুলাদীতে রাস্তার কাজে ধীরগতি। দুর্ভোগে কয়েক গ্রামের মানুষ ময়মনসিংহ সদরে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপিত তথ্য চাইতেই সাংবাদিক দম্পতি হেনস্তা: ইউএনও অফিসের কর্মচারীর বিরুদ্ধে এসপি অফিসে অভিযোগ ‎সিংগাইরে প্রধান শিক্ষক অপসারণের দাবিতে গণস্বাক্ষরসহ অভিযোগ কাহালুতে স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ভাবনা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত রূপগঞ্জের রূপসী কাজীপাড়ায় ডাইং মিলের বিষাক্ত পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, জনদুর্ভোগ চরমে কুমিল্লায় লবণ বোঝাই কভার্ড ভ্যান  ইয়াবা উদ্ধার, আটক ৫ পলাশবাড়ীতে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ রাম মুর্তি নির্মান কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা উদ্বেগ

যখন পুলিশের নাম শুনেই ভয় পায় মানুষ

reporter ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
calendar প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬, ১:৪০ অপরাহ্ণ

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কী? অস্ত্র, আইন কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতা- এসবের চেয়েও বড় শক্তির নাম মানুষের আস্থা। সেই আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্র, তার প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন। আর সেই কারণেই পুলিশ বাহিনীকে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের প্রথম এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিনিধি হলো পুলিশ।

কিন্তু যখন সেই পুলিশকে ঘিরেই ভয়, আতঙ্ক, হয়রানি কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, প্রশ্নের মুখে পড়ে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পুরোনো ও নষ্ট মোবাইল ফোন কেনাবেচা করা এক ব্যক্তিকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তার পরিবারের কাছে অর্থ দাবি করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য, স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে অর্থ জোগাড় করতে হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ঘটনাটি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। কিন্তু একটি অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বাইরেও এখানে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন রয়েছে- কেন পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসে?

বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। জঙ্গিবাদ মোকাবিলা, সন্ত্রাস দমন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীটির অবদান অনস্বীকার্য। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসংখ্য পুলিশ সদস্য প্রাণ দিয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অস্থিরতা- প্রতিটি সংকটেই পুলিশকে সামনের সারিতে দেখা গেছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, বেআইনি আটক, নির্যাতন কিংবা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানোর অভিযোগও নতুন নয়। সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন অভিযোগ উঠে আসে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত হয়, কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিও হয়, আবার অনেক অভিযোগ সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়।

এই বাস্তবতা মানুষের মনে একটি ভয় তৈরি করে।

একজন সাধারণ মানুষ যখন থানায় যাওয়ার আগে দশবার ভাবেন, যখন পুলিশের গাড়ি দেখলে নিরাপত্তার বদলে অস্বস্তি অনুভব করেন, তখন বুঝতে হবে কোথাও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

পুলিশের হাতে রাষ্ট্র একটি বিশেষ ক্ষমতা অর্পণ করে। কাউকে গ্রেপ্তার করা, জিজ্ঞাসাবাদ করা কিংবা আইন প্রয়োগের জন্য বলপ্রয়োগের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে নেই। তাই এই ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ক্ষমতার অপব্যবহার হলে ক্ষতির মাত্রাও হয় অনেক বেশি।

ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু প্রায় তিন শতাব্দী আগে বলেছিলেন, “যে কোনো ক্ষমতাই অপব্যবহারের দিকে ঝোঁকে, যদি না সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা থাকে।” আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি এই উপলব্ধি থেকেই তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশ সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য রয়েছে স্বাধীন সংস্থা- ইন্ডিপেনডেন্ট অফিস ফর পুলিশ কন্ডাক্ট। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বডি ক্যামেরার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কারণ, একটি বিষয় সবাই উপলব্ধি করেছে- পুলিশের প্রতি আস্থা ছাড়া কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশেও পুলিশের আধুনিকায়ন নিয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল সেবা, অনলাইন জিডি, সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান এবং অভিযোগ তদন্তে দৃশ্যমান স্বচ্ছতা।

একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ মানেই পুরো পুলিশ বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। বরং কয়েকজন অসাধু সদস্যের কর্মকাণ্ডের কারণেই হাজারো সৎ ও নিষ্ঠাবান সদস্যের অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সৎ পুলিশ কর্মকর্তারাই।

কারণ, জনগণের আস্থা হারিয়ে গেলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতাও কমে যায়। একজন পুলিশ সদস্য যদি মানুষের কাছে বন্ধু নয়, বরং ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন, তাহলে অপরাধ দমনও কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ অভিযোগ করতে চায় না, সাক্ষী হতে চায় না, তথ্য দিতে চায় না। এর ফল ভোগ করে পুরো সমাজ।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য সব সময় সমান থাকে না। একজন দরিদ্র দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা রিকশাচালকের পক্ষে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করা যেমন কঠিন, তেমনি প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা আরও কঠিন। তাই আইনশাসনের মূল দর্শনই হলো দুর্বল মানুষটিকেও সুরক্ষা দেওয়া।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিকের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো এই বিশ্বাস- তার সঙ্গে অন্যায় হলে আইন তার পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু যদি মানুষ মনে করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করে লাভ নেই, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি গণতন্ত্রের জন্যও অশনিসংকেত।

সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান একবার বলেছিলেন, “সুশাসনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো জবাবদিহি।” পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, বডি ক্যামেরা চালু করা, থানাগুলোতে কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অযাচিত প্রভাব থেকে পুলিশকে মুক্ত রাখাও জরুরি।

সবশেষে, মিরপুরের ওই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু এই ঘটনার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো- একজন সাধারণ মানুষ পুলিশের নাম শুনে কি আশ্বস্ত হন, নাকি আতঙ্কিত হন?

এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে, আমাদের আইনশাসন কতটা শক্তিশালী, আমাদের রাষ্ট্র কতটা মানবিক এবং আমাদের গণতন্ত্র কতটা সুস্থ।

কারণ, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি বন্দুক নয়, মানুষের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।

পুলিশের ইউনিফর্ম ক্ষমতার প্রতীক হওয়ার আগে জনগণের আস্থার প্রতীক। সেই আস্থা রক্ষা করা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সরকার এবং সমাজ- সবার যৌথ দায়িত্ব। কেননা, আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই- কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

Please Share This Post in Your Social Media

একই রকম সংবাদ
© সকল স্বত্ব দৈনিক ঘোষণা অনলাইন ভার্শন কর্তৃক সংরক্ষিত
Site Customized By NewsTech.Com