রাতের আঁধারে রাস্তার পাশে অসুস্থ স্বামীকে ফেলে গেছে স্ত্রী ও সন্তানেরা। একজন পুরুষ ও একজন পরিবারের কর্তা ব্যক্তি হিসেবে কতই না কষ্ট সহ্য করে পরিবারের সকল সদস্যদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর জন্য প্রবাসে কাটিয়েছেন বছরের পর বছর। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম এবং পরিবার-পরিজন কে রেখে হাজার মাইল দূরে প্রবাসে বছরের পর অতিবাহিত করার পর অসুস্থ জনিত কারণে দেশে এসে নিজের দুর্ভাগ্য এতটাই খারাপ হবে ও পরিবারের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টের পরিমাণ এতটাই অস্বাভাবিক হবে এ বিষয়গুলো হয়তো ত তার অজানা ছিল।
ভাগ্যের নির্মম বেড়াজালে আজ তাকে পরিবারের সকল প্রিয়জনদের কাছ থেকে এমন নির্মমতা, হৃদয়বিদারক কষ্ট ও অমানুষিক, অমানবিক আচরণ বেদনাদায়ক। এ কষ্টের দায়ভার এখন কে নেবে? অসুস্থ অসহায় দিশেহারা এই অসহায় মানুষটির দায়িত্বভার এবং চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে? হয়তো এমন প্রশ্নই তার মনে জেগে উঠছে এবং তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পরিবারের মানুষের মানবতা আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে! স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী ওই ব্যক্তির সহধর্মিনী ও সন্তান কর্তৃক গত শনিবার রাতে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ওই ব্যক্তির নাম জামাল উদ্দিন (৪৯)। তিনি কালমেঘা গ্রামের বাসীন্দা ফজর আলীর ছেলে। তিনি আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের জন্য ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য গত ২৫ বছর আগে নিজ গ্রামের পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাঁশবাড়ি দক্ষিণ পাড়া ইয়ার উদ্দিন মোড় এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রবাসী হিসেবে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি প্রায় ১২ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ মাস আগে দেশে ফিরে এসেছেন। পরিবারে তাঁদের রায়হান (২২) ও মীম (১৯) নামে দুজন সন্তান রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী ওই ব্যক্তির সহধর্মিনী ও সন্তান কর্তৃক গত শনিবার গভীর রাতে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। প্রবাসজীবনের সকল উপার্জিত টাকা তিনি তার সহধর্মিণীর কাছে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তিনি দেশে ফেরার পর অসুস্থ জনিত কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সঠিক চিকিৎসা ও দেখাশোনা নিয়ে পরিবারের কোন সহযোগিতা পায়নি ও পরিবার তাকে অবহেলা ও অযত্ন করেছেন। গত শনিবার গভীর রাতে জামাল উদ্দিনকে তার পৈতৃক ভিটার পাশের সড়কে ফেলে রেখে যান তার স্ত্রী রিনা আক্তার ও সন্তানেরা। রাতে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর তাকে মানবেতর অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে রবিবার ওই গ্রামের স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এ বিষয়টি নজরে আসলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। পরে ওই ব্যক্তিকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখার বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় কালমেঘা গ্রামের উত্তর-পূর্ব পাড়ায় তার ভাতিজি ইসমতারার বাড়িতে জামাল উদ্দীন কে আশ্রয় দেওয়া হয়। স্থানীয়রা অসুস্থ জামাল উদ্দিনের চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তার পাশাপাশি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বহুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মোশাররফ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর স্থানীয়রা এগিয়ে এসে জামাল উদ্দিনকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। জামাল উদ্দিনের বড় ভাই সোহরাব আলী বলেন, আমার ভাইকে আমি অনেক আগেই সাবধান করেছিলাম শ্বশুরবাড়িতে না যেতে। কিন্তু সে এলাকার কারও কথা শোনেনি। অনেকের কাছে শুনতে পেলাম, তার স্ত্রী সন্তানেরা অসুস্থ অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে চলে গেছে।জামাল উদ্দিনের সহধর্মিণী রিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামীকে আমি কয়েক মাস আগে ডিভোর্স দিয়েছি। তার সাথে এখন আর আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাঁর রাস্তায় পড়ে থাকার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।এ ঘটনার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম বলেন, ইতোমধ্যে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে এ বিষয়টি জানানো হয়েছে। ওই ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা হবে।
উল্লেখ্য আজ সোমবার বিকেলে সখীপুর উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের কালমেঘা গ্রামে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ওই অসুস্থ প্রবাসী ব্যক্তির বড় ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাথে কথা বলে জানা গেছে ও দেখা গেছে, ওই প্রবাসী অসুস্থ (কিডনী জনিত অসুস্থ) জামাল উদ্দিন তার বড় ভাই সোহরাব আলীতে বাড়িতে আছেন। ওই প্রবাসী বিপদের এই সংকটকালীন মুহূর্তে তার বড় ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন। বড় ভাইয়ের পরিবারের লোকজন তার সার্বিক দেখাশোনা করছেন। শারীরিকভাবে তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তার বড় ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন তিনি সারাদিনে অল্প একটু জুস পান করেছেন এবং কিডনিজনিত সমস্যায় ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে সারাদিন পরিবারের কারো সঙ্গে কোন কথা বলেননি।