শরৎ এলেই প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে সাদা কাশফুলের চাদর বিছিয়ে দেয়।দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজের বুকজুড়ে অসংখ্য সাদা স্বপ্ন মাথা দোলাচ্ছে। নীল আকাশের নিচে বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের সারি যেন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো নীরব কবিতা, যে কবিতা পড়তে শব্দের প্রয়োজন হয় না, শুধু একটু থেমে দাঁড়াতে হয়।শহরের ব্যস্ততা, যানজট, ইট-পাথরের দেয়াল, প্রতিদিনের হিসাব-নিকাশ আর অস্থিরতার ভিড়ে হঠাৎ একটুখানি কাশফুল চোখে পড়লে মনটা কেমন যেন অন্য কোথাও চলে যায়।
মনে হয়, এত ব্যস্ততার মধ্যেও পৃথিবী তার সৌন্দর্যটুকু ধরে রেখেছে।আমাদের জন্যই হয়তো রেখে দিয়েছে একটু আকাশ, একটু বাতাস, একটু রোদ, আর একমুঠো সাদা কাশের মায়া।
কাশফুল শুধু শরতের সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, আমার কাছে কাশফুল অনেকটা মানুষের জীবনের মতো।কাশফুলের জীবন খুব দীর্ঘ নয়।তবু তার স্বল্প আয়ুতেই সে চারপাশকে সুন্দর করে তোলে।বাতাস এলে দোলে, ঝড় এলে নুয়ে পড়ে, কখনো কখনো মাটির কাছাকাছি চলে যায়।কিন্তু ঝড় থেমে গেলে আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।তার এই নীরব ফিরে দাঁড়ানোর মধ্যে যেন জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে,পড়ে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
মানুষের জীবনও তো এমনই।কেউ জীবনে অনেক কিছু পেয়েও সুখী নয়, আবার কেউ অল্প কিছু নিয়েই পরম তৃপ্তিতে দিন কাটায়।কারও ঘর ভরা মানুষ, অথচ বুকের ভেতর একাকিত্ব; কারও চারপাশ ফাঁকা, তবু হৃদয় পরিপূর্ণ।কেউ অনেক ভালোবাসা পেয়েও হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচে, কেউ ভালোবাসা না পেয়েও ভালোবাসার স্মৃতি আঁকড়ে রাখে।
সুখ আসলে কতটুকু জিনিস?একটু নিশ্চিন্ত ঘুম, প্রিয় মানুষের একটি ফোন, মায়ের হাতের রান্না, বাবার মুখের হাসি, দীর্ঘদিন পর দেখা কোনো আপনজন, অসুস্থতার পর সুস্থ হয়ে ওঠা, কিংবা সারাদিনের ক্লান্তি শেষে নিজের ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার স্বস্তি-এসবের মধ্যেই তো জীবনের কত বড় সুখ লুকিয়ে থাকে।
কিন্তু আমরা প্রায়ই সুখকে অনেক দূরে খুঁজতে যাই।ভাবি, আরও একটু টাকা হলে সুখী হব, আরও সুন্দর একটি বাড়ি হলে শান্তি পাব, আরও ভালো একটি চাকরি হলে জীবন পূর্ণ হবে, আরও কিছু মানুষ আমাকে ভালোবাসলে মন ভরে যাবে।অথচ জীবন যত এগোয়, ততই বুঝতে পারি, প্রাপ্তির তালিকা যত দীর্ঘ হয়, চাওয়ার তালিকাও তত দীর্ঘ হতে থাকে।
একটি পাওয়া আরেকটি চাওয়ার জন্ম দেয়।
একটি স্বপ্ন পূরণ হলে আরেকটি স্বপ্ন এসে দরজায় দাঁড়ায়।তারপর একদিন হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি যে জিনিসগুলো পাওয়ার জন্য এতদিন ছুটেছি, সেগুলোর অনেকটাই তো পেয়েছি।
কিন্তু সেই পাওয়ার আনন্দটুকু উপভোগ করার সময়ই হয়ে ওঠেনি।
জীবন তখন আমাদের খুব নীরবে প্রশ্ন করে-“তুমি কি সত্যিই বেঁচেছ, নাকি শুধু পাওয়ার জন্য ছুটেছ?”আমাদের জীবনে না-পাওয়ার গল্পও কম নয়।কেউ প্রিয় মানুষকে পেয়েও ধরে রাখতে পারে না। কেউ সংসার চায়, কিন্তু সংসার টেকে না।কেউ সন্তান চায়, কেউ ভালোবাসা চায়, কেউ একটি নিরাপদ আশ্রয় চায়, কেউ শুধু চায় এমন একজন মানুষ, যার কাছে নিজের সমস্ত দুর্বলতা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
কেউ খুব চেষ্টা করেও নিজের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারে না।কেউ জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্নটিকে নিজের চোখের সামনেই ভেঙে যেতে দেখে-তবু জীবন থেমে থাকে না।এই জায়গাতেই কাশফুল যেন আবার আমাদের কথা বলে।
বাতাসে যখন কাশফুলগুলো একসঙ্গে দুলতে থাকে, দূর থেকে মনে হয় তারা আনন্দে নাচছে।কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়-প্রতিটি ফুলই বাতাসের ধাক্কা সামলাচ্ছে।তার সৌন্দর্যের পেছনেও আছে দোলা, আছে নুয়ে পড়া, আছে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।
মানুষের হাসিও অনেকটা তেমন।সব হাসির ভেতরে আনন্দ থাকে না।কখনো কখনো হাসি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার এক নীরব কৌশল।
কেউ কষ্ট লুকিয়ে হাসে, কেউ অভিমান লুকিয়ে কথা বলে, কেউ চোখের জল মুছে অন্যকে বলে “আমি ভালো আছি।”অথচ ভালো থাকা আর ভালো থাকার ভান করা-দুটো এক জিনিস নয়।
জীবন আমাদের সবাইকে কোনো না কোনোভাবে ক্লান্ত করে।দায়িত্বের ক্লান্তি, সম্পর্কের ক্লান্তি, অপেক্ষার ক্লান্তি, বারবার নিজেকে প্রমাণ করার ক্লান্তি, ভুল বোঝাবুঝির ক্লান্তি, প্রিয় মানুষকে হারানোর ক্লান্তি, নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধের ক্লান্তি-সব মিলিয়ে কখনো কখনো মনে হয়, আর পারছি না।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, মানুষ ঠিক তখনই নিজের ভেতর থেকে আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু খুঁজে পায়।হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য।
আমরা যতটা ভেঙে যাই, তার চেয়েও বেশি বার আমাদের নতুন করে গড়ে ওঠার সুযোগ আসে।শরতের কাশফুল তাই আমার কাছে শুধু সৌন্দর্য নয়, এক ধরনের আশ্বাস।
কাশফুল বলে-ঝড় এলে একটু নুয়ে পড়ো, তাতে লজ্জা নেই।কিছুদিন ক্লান্ত থাকো, তাতেও অপরাধ নেই।কিছু মানুষ চলে গেলে কেঁদে নাও।কিছু স্বপ্ন ভেঙে গেলে মন খারাপ করো।কিছু না-পাওয়া নিয়ে আফসোস করো।
তবু একদিন আবার মাথা তুলে দাঁড়িও।কারণ জীবনের সব হারানোই শেষ হারানো নয়।কিছু হারানো আমাদের অন্য কিছু পাওয়ার জন্য জায়গা করে দেয়।কিছু বন্ধ দরজা আমাদের এমন পথে নিয়ে যায়, যে পথের কথা আমরা কখনো ভাবিনি।কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায়, কারণ হয়তো সেই সম্পর্কের ভেতর আমাদের জন্য আর কোনো শান্তি অপেক্ষা করছিল না।কিছু স্বপ্ন পূরণ হয় না, কারণ হয়তো আমাদের জীবনের গল্পটি আমরা যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম, তার চেয়ে অন্যরকম কোনো গল্প আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
তাই সব না-পাওয়াকে ব্যর্থতা বলা যায় না।সব বিচ্ছেদকে পরাজয় বলা যায় না।সব কান্নাকে দুর্বলতা বলা যায় না।জীবনের একটা বয়সে এসে আমরা বুঝতে শিখি- সবকিছু পেয়ে গেলে হয়তো আমরা কৃতজ্ঞতা শেখার সুযোগই পেতাম না।আর কৃতজ্ঞতা, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর শান্তিগুলোর একটি।যা পেয়েছি, তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ।যা পাইনি, তার জন্যও হয়তো একদিন বলব-আলহামদুলিল্লাহ।কারণ আজ যে ঘটনাটিকে আমরা কষ্ট বলে মনে করছি, সময়ের অনেক পরে ফিরে তাকালে হয়তো বুঝব, সেই কষ্টটিই আমাদের জীবনের কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল।
মানুষ সবসময় জানে না কোন পথে তার কল্যাণ লুকিয়ে আছে।আমরা একটি দরজা খুলতে চাই, অথচ দরজাটি বন্ধ থাকে।আমরা একটি মানুষকে ধরে রাখতে চাই, অথচ সে চলে যায়।আমরা একটি জায়গায় পৌঁছাতে চাই, অথচ বারবার ব্যর্থ হই।তখন মনে হয়, জীবন আমাদের সঙ্গে অন্যায় করছে।কিন্তু জীবন সবসময় আমাদের ইচ্ছামতো চলে না বলেই জীবন অর্থহীন নয়।বরং জীবনের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই-আমরা সব জানি না, সব বুঝি না, সব নিয়ন্ত্রণও করতে পারি না।
তবু পথ চলি।বিশ্বাস করি।অপেক্ষা করি।আবার ভালোবাসি।আবার স্বপ্ন দেখি।আবার কাশফুলের মতো মাথা তুলে দাঁড়াই।শরৎ এলে তাই কাশফুলের দিকে তাকিয়ে মনে হয়-প্রকৃতি যেন আমাদের খুব সহজ একটি কথা মনে করিয়ে দিতে আসে:জীবনকে শুধু হিসাব করে বাঁচতে নেই।কত পেলাম, কত হারালাম, কে আমাকে ভালোবাসল, কে ছেড়ে গেল, কোন স্বপ্ন পূরণ হলো, কোনটা হলো না, এই হিসাব করতে করতে যেন জীবনের আসল সৌন্দর্যটাই হারিয়ে না ফেলি।কখনো একটু থামি।আকাশের দিকে তাকাই।বাতাস অনুভব করি।কাশফুলের দোলা দেখি।প্রিয় মানুষটির পাশে বসি।নিজের জন্য একটু সময় রাখি।আর মনে মনে বলি-
“জীবন, তোমার কাছে আমার অনেক অভিযোগ ছিল।আজ সেসবের কিছুটা সরিয়ে রাখলাম।যা হারিয়েছি, তার জন্য আফসোস নয়;
যা পেয়েছি, তার জন্য কৃতজ্ঞতা।যা আসেনি, তার জন্য অপেক্ষা।আর যা আসবে, তা আমার রবের সুন্দর পরিকল্পনার অংশ-এই বিশ্বাসটুকু থাক।”সুখ মানে সবকিছু পাওয়া নয়।
সুখ মানে, যা আছে, তার সৌন্দর্য দেখতে শেখা। শান্তি মানে জীবনে কোনো ঝড় না থাকা নয়; বরং ঝড়ের মাও নিজের ভেতরে একটি আশ্রয় খুঁজে পাওয়া।
পরিপূর্ণতা মানে জীবনে কোনো অপূর্ণতা না থাক
নয়; বরং অপূর্ণতার মাঝেও আল্লাহর দেওয়া জীবনটাকে ভালোবেসে ফেলা।আর বেঁচে থাকা মানেই প্রতিদিন নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানো।ঠিক যেমন শরতের কাশফুল।বাতাস তাকে দোলায়, বৃষ্টি তাকে ভিজিয়ে দেয়, ঝড় তাকে নুইয়ে দেয়, তবু ঋতু এলে সে আবার সাদা হয়ে মাঠ ভরিয়ে তোলে।
মানুষের জীবনও তেমনই হোক।দুঃখ আসুক, কিন্তু আমাদের ভেঙে না দিক।না-পাওয়া আসুক, কিন্তু আমাদের অকৃতজ্ঞ না করুক।বিচ্ছেদ আসুক, কিন্তু আমাদের ভালোবাসতে ভুলিয়ে না দিক।
ক্লান্তি আসুক, কিন্তু আমাদের পথচলা থামিয়ে না দিক।আর সুখ যখন আসবে, তখন যেন আমরা তাকে চিনতে পারি।কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো দুঃখ পাওয়া নয়-সুখ যখন নিঃশব্দে পাশে এসে বসে, তখন তাকে চিনতে না পারা।
তাই এই শরতে কাশফুলের সাদা মায়ার কাছে দাঁড়িয়ে জীবনের প্রতি একটু কোমল হই।
নিজের প্রতি একটু সদয় হই।অন্যের না-বলা কষ্টটুকু বোঝার চেষ্টা করি।যারা আমাদের ভালোবাসে, তাদের একটু বেশি করে ভালোবাসি।যারা চলে গেছে, তাদের জন্য অভিশাপ নয়, শান্তি কামনা করি।আর যারা এখনও পাশে আছে, তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে ধরে না নিয়ে কৃতজ্ঞ হই।শরৎ আসুক বারবার।কাশফুল ফুটুক বারবার।আকাশ নীল হোক বারবার।আর আমাদের জীবন, তার সমস্ত পাওয়া, না-পাওয়া, হাসি, কান্না, ক্লান্তি, অপেক্ষা আর ভালোবাসা নিয়ে-প্রতিবার একটু বেশি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠুক।কাশফুলের মতোই-নরম, অথচ দৃঢ়।
দোলায়িত, অথচ ভেঙে না পড়া।স্বল্পায়ু, অথচ সৌন্দর্যে পূর্ণ।আর প্রতিটি ঝড়ের পর নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো আশাবাদী।কারণ শেষ পর্যন্ত জীবন তো একটাই-
তাই সবটুকু না পেলেও, যা পেয়েছি তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলে বেঁচে থাকাই হয়তো সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি।