1. masudkhan89@yahoo.com : Ghoshana Desk :
  2. zunayedafif18@gmail.com : Mahir Al Mahbub : Mahir Al Mahbub
  3. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
স্কুলে পুনঃভর্তি ফি: নীরব চাঁদাবাজির নতুন রূপ - দৈনিক ঘোষণা
ব্রেকিং নিউজ :
বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী নিম্নচাপ, উপকূলে বৈরী আবহাওয়া ফুলবাড়ীতে ডোবার পানিতে পড়ে দুই বছরের শিশুর মৃত্যু ডাকবাংলোর পুকুরে ডুবে ঝরল মেধাবী ছাত্রের প্রাণ বোয়ালখালীতে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার রাজবাড়ীতে র‍্যাবের অভিযানে ৫ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রধারী ৫ জন গ্রেপ্তার খুলনা মহানগর যুবদলের নবগঠিত ৩১টি ওয়ার্ড ও ৩ টি ইউনিয়ন কমিটির পরিচিতি সভায় খালিশপুর থানা যুবদল জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত ফিলোন ফিড শরীয়তপুর ডিপোর উদ্বোধন অনুষ্ঠিত আত্রাই উপ জেলার ভ্রাম্যমান আদালতে মাদক সেবনের অভিযোগে দুইজনকে কারাদণ্ড প্রদান। র‍্যাবের পৃথক অভিযানে কক্সবাজারে হত্যা মামলার আসামি ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার

স্কুলে পুনঃভর্তি ফি: নীরব চাঁদাবাজির নতুন রূপ

reporter ঘোষণা ডেস্ক
calendar প্রকাশিত: ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৪৭ অপরাহ্ণ

শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার- এ কথা আমরা সংবিধানে লিখে রেখেছি, রাষ্ট্রীয় নীতিতে স্বীকার করেছি এবং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশে এমন কিছু প্রথা চালু আছে, যা এই মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একই স্কুলে একই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি শিক্ষাবর্ষে “পুনঃভর্তি ফি” আদায় তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রশ্ন হলো, যে শিক্ষার্থী কখনোই স্কুল ত্যাগ করেনি, তাকে আবার ভর্তি করানোর প্রয়োজন কোথায়?
এই প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই। কারণ পুনঃভর্তি ফি কোনো শিক্ষাগত প্রয়োজন নয়, কোনো প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতাও নয়। এটি মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক আয়ের কৌশল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীরব চাঁদাবাজির রূপ নিয়েছে।

ভর্তি ও পদোন্নতির ধারণাগত বিভ্রান্তি
শিক্ষাবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা অনুযায়ী ভর্তি (admission) একটি এককালীন প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থী যখন প্রথমবার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়, তখন তার ভর্তি সম্পন্ন হয়। এরপর প্রতি বছর সে এক শ্রেণি থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়- যাকে বলা হয় পদোন্নতি (promotion)। এখানে নতুন করে ভর্তি হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক স্কুল বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের পুনঃভর্তি ফরম পূরণ করায়, পুনঃভর্তি ফি নেয় এবং এই ফি পরিশোধ না করলে শিক্ষার্থীকে নতুন শ্রেণিতে উঠতে দেওয়া হয় না। এটি নিছক শব্দের বিভ্রান্তি নয়; এটি একটি সচেতন কৌশল, যার মাধ্যমে একটি অযৌক্তিক আর্থিক দাবি নিয়মে পরিণত হয়েছে।

নীতিমালা আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ফি নির্ধারণ ও আদায়সংক্রান্ত নীতিমালা একেবারে অনুপস্থিত নয়। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ফি আদায়ের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দিয়েছে। কোথাও কোথাও ভর্তি ফি একবার নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখও আছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নির্দেশনার কার্যকর প্রয়োগ খুবই দুর্বল।
তদারকির ঘাটতি, নিয়মিত অডিটের অভাব এবং শাস্তির নজির না থাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জানে- নিয়ম ভাঙলেও বড় কোনো পরিণতি হবে না। এই সুযোগেই পুনঃভর্তি ফি আজ অনেক স্কুলে “স্বাভাবিক নিয়ম” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

অভিভাবকদের অসহায় নীরবতা
এই প্রথা টিকে থাকার আরেকটি বড় কারণ অভিভাবকদের অসহায়তা। অধিকাংশ অভিভাবকই জানেন, একই স্কুলে পুনঃভর্তি ফি আদায় অন্যায়। তবু তাঁরা প্রতিবাদ করেন না। কারণ প্রতিবাদ করলে সন্তানের পড়াশোনা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত, আর স্কুল বদলানো বাস্তবে সহজ নয়।
একজন অভিভাবক একা প্রতিবাদ করলে তাঁকে অনেক সময় ‘ঝামেলাপ্রিয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে প্রতিবাদ সংগঠিত হয় না। এই নীরবতাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ
পুনঃভর্তি ফি সাধারণত শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই এককালীনভাবে আদায় করা হয় এবং এর অঙ্ক মোটেও সামান্য নয়, প্রায় কয়েক হাজার। এর সঙ্গে যোগ হয় সেশন চার্জ, উন্নয়ন ফি, পরীক্ষার ফি- ফলে বছরের শুরুতেই অভিভাবকদের বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করতে হয়।
একটি পরিবারে যদি একাধিক সন্তান একই স্কুলে পড়ে, তাহলে এই চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয় সঞ্চয় ভাঙতে, ঋণ নিতে বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে। শিক্ষা তখন আর উন্নয়নের হাতিয়ার থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার উৎস।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই পুনঃভর্তি ফি কোথায় যায়? এর কোনো স্বচ্ছ হিসাব সাধারণত পাওয়া যায় না। স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রায়ই নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না, এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা শিক্ষার মান বৃদ্ধির কথা বলা হলেও তার পক্ষে সুস্পষ্ট তথ্য ও হিসাব উপস্থাপন করা হয় না।
ফলে পুনঃভর্তি ফি পরিণত হয় এমন একটি আয়ে, যার সঙ্গে জবাবদিহির সম্পর্ক নেই। আর যেখানে জবাবদিহি নেই, সেখানে অপব্যবহারের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

শিক্ষা কি পণ্য?
এই প্রথা একটি গভীর সংকেত দেয়- আমরা ধীরে ধীরে শিক্ষাকে ব্যবসায় পরিণত করছি। শিক্ষার্থী এখানে আর শিক্ষার অংশগ্রহণকারী নয়, সে একটি গ্রাহক, যাকে প্রতি বছর নতুন করে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অনৈতিক নয়, এটি শিক্ষার মৌলিক দর্শনের বিরোধী।
শিক্ষা কোনো মৌসুমি সেবা নয় যে প্রতি বছর নতুন করে চুক্তি করতে হবে। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা, আস্থা ও ন্যায্যতা।

করণীয় কী?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি।
প্রথমত, একই স্কুলে পুনঃভর্তি ফি আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কার্যকর তদারকি ও মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নিয়মিত অডিট ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
তৃতীয়ত, নীতিমালা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, অভিভাবক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় ও সংগঠিত হতে হবে, কারণ যৌথ প্রতিবাদ ছাড়া এই প্রথা ভাঙা কঠিন।

উপসংহার
একই স্কুলে প্রতি বছর পুনঃভর্তি ফি কোনো প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়। এটি একটি পরিকল্পিত, নীরব শোষণ- যা শিক্ষার নামে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রথা বন্ধ না হলে শিক্ষা খাতের নৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হবে।
শিক্ষা যদি সত্যিই অধিকার হয়, তবে তা চাঁদাবাজির আওতার বাইরে রাখতে হবে। এখনই সময় নীরবতা ভাঙার।
এই নীরব চাঁদাবাজি বন্ধ হোক- শিক্ষা ফিরে পাক তার ন্যায্য, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান।

ডক্টর এ জেড এম মাইনুল ইসলাম
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Please Share This Post in Your Social Media

একই রকম সংবাদ
© সকল স্বত্ব দৈনিক ঘোষণা অনলাইন ভার্শন কর্তৃক সংরক্ষিত
Site Customized By NewsTech.Com