এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঠাকুরগাঁওয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। শূন্য পাসের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের ইতোমধ্যে শোকজ করেছে জেলা শিক্ষা অফিস। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক সংকট ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ঠাকুরগাঁও জেলায় মোট ৩৯৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৪ জন। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আকচা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, অনভারডিঘি উচ্চ বিদ্যালয়, মাধবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, তেওয়ারিগাঁ উচ্চ বিদ্যালয় ও রামপুর ভাতুরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
ফল প্রকাশের পর এসব প্রতিষ্ঠানে দেখা দিয়েছে হতাশা। অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন ফলাফল নিয়ে আনন্দ-উল্লাস, তখন শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছে উদ্বেগ ও নীরবতা। একটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস না করায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।রুহিয়া উপজেলার মাধবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নেওয়া নো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে ফল প্রকাশের দিন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সেখানে উৎসবের আমেজ দেখা যায়নি।
আকচা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “১৯৯২ সাল থেকে আমাদের বিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটেনি। এবারই প্রথম কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। কেন এমন ফল হলো, তা নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে বসে পর্যালোচনা করা হবে। কারণ চিহ্নিত করে আগামীতে যাতে এমন ফলাফল আর না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাবেক প্রধান শিক্ষক ও জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক শাহাজাহান-ই-হাবীব বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল শুধু পরীক্ষার সময়ের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক সংকট, পাঠদানের মান, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর ফলাফলের বড় প্রভাব রয়েছে। শূন্য পাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আকতার বলেন, “দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ঠাকুরগাঁও জেলায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। জেলার ৩৯৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৪ জন। গত বছরও জেলার দুটি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। আমরা ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদারকি ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার পর এবার সেখানকার শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হয়েছে। এবার যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, তাদের ফল বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের শোকজ করা হয়েছে। তাদের জবাব পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও একাডেমিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে তদারকি করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। শুধু শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান নয়, জেলার সামগ্রিক শিক্ষার মান বাড়াতে আমরা নিয়মিত মনিটরিং, শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। ভবিষ্যতে যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন ফলাফল না হয়, সে বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিস থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে।”
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক রফিকুল হক বলেন, “শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক সংকট ও প্রশাসনিক তদারকির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কোথাও শিক্ষক বা শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি থাকলে তা পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। জেলার শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতোমধ্যে কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ফলাফল আরও ভালো করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, জেলার কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও নিয়মিত পাঠদানের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে ফলাফল আরও খারাপ হতে পারে। তাদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পাসের ঘটনা শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষক-অভিভাবকের প্রত্যাশা এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ জড়িত। তাই শূন্য পাসের ঘটনাকে সতর্ক সংকেত হিসেবে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।