1. masudkhan89@yahoo.com : Ghoshana Desk :
  2. zunayedafif18@gmail.com : Mahir Al Mahbub : Mahir Al Mahbub
  3. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
মুঘল স্থাপত্য, ইসলামি ঐতিহ্য ও উত্তরবঙ্গের গৌরবের এক অনন্য নিদর্শন: নিদাড়িয়া মসজিদ - দৈনিক ঘোষণা
ব্রেকিং নিউজ :
জামালপুরে ট্রাকচাপায় পৃষ্ঠ হয়ে শ্রমিক নেতাসহ দুজন নিহত, আহত ১ টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে দেড় শতাধিক অবৈধ জাল জব্দ, আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস দিনাজপুরে বিজিবির আয়োজনে সীমান্তবর্তী এলাকার বেসামরিক যুবকদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণের উদ্বোধন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর বদলে যাচ্ছে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও গ্যাস সংকট নিরসনে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপঃ লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল ডেমরার মীরপাড়ায় প্লাস্টিক গুঁড়ো কারখানার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ রংপুরে পল্লী উন্নয়নে নতুন অধ্যায় বিআরডিবির বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্বোধন, পল্লী মেলার সূচনা, ঋণ, প্রণোদনা বিতরণ চার বছরে বেকারি পণ্য সরবরাহকারী থেকে ৩২ দোকান ও প্লটের মালিক, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন মুঘল স্থাপত্য, ইসলামি ঐতিহ্য ও উত্তরবঙ্গের গৌরবের এক অনন্য নিদর্শন: নিদাড়িয়া মসজিদ নওগাঁ সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক

মুঘল স্থাপত্য, ইসলামি ঐতিহ্য ও উত্তরবঙ্গের গৌরবের এক অনন্য নিদর্শন: নিদাড়িয়া মসজিদ

reporter জুবাইর আহমেদ খান রোহান
calendar প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ২:৪২ অপরাহ্ণ

লালমনিরহাটের মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অসংখ্য নিদর্শন। তারই মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও দর্শনীয় স্থাপনা নিদাড়িয়া মসজিদ। প্রায় চার শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক মসজিদ শুধু মুসল্লিদের ইবাদতের স্থান নয়; বরং উত্তরাঞ্চলের ইসলামি ঐতিহ্য, মুঘল স্থাপত্যশৈলী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। সময়ের বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়েও আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, পর্যটক ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কিশামত নগরবন্দ মৌজায়, রংপুর–কুড়িগ্রাম মহাসড়কের বড়বাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত নিদাড়িয়া মসজিদ। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে তালিকাভুক্ত এই স্থাপনাটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ঐতিহ্যের নিদর্শন।

মসজিদের দেয়ালে সংরক্ষিত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১১৭৬ হিজরি সনে (প্রায় ১৭৬২–৬৩ খ্রিস্টাব্দ) তৎকালীন মুঘল প্রশাসনের অধীনে সুবেদার মাসুদ খাঁ ও তাঁর পুত্র মনছুর খাঁর তত্ত্বাবধানে মসজিদটি নির্মিত হয়। তবে স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, এর ইতিহাস আরও পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, শিলালিপিই মসজিদের নির্মাণকাল নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে নিদাড়িয়া মসজিদ মুঘল আমলের নির্মাণকলার এক অসাধারণ নিদর্শন। প্রায় ৪২ ফুট দীর্ঘ ও ১৬ ফুট প্রশস্ত এক কক্ষবিশিষ্ট মসজিদটির ওপর রয়েছে তিনটি গম্বুজ। চার কোণায় চারটি শক্তিশালী পিলার এবং সম্মুখভাগে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। নির্মাণে ব্যবহৃত পোড়ামাটির ইট, দেয়ালের পুরুত্ব, অলংকরণ ও গম্বুজের বিন্যাসে মুঘল শিল্পরীতির স্পষ্ট ছাপ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।

মসজিদের প্রবেশপথের বাম পাশে একটি দোচালা কক্ষ রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এটি একসময় ইমামের আবাস কিংবা ধর্মীয় সামগ্রী সংরক্ষণের কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মসজিদের সামনে রয়েছে বিস্তীর্ণ ঈদগাহ মাঠ। উত্তর-পূর্ব কোণে একটি কবরস্থান এবং উত্তর পাশে একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা অবস্থিত। মসজিদের বাম পাশে থাকা একটি বাঁধানো কবর স্থানীয়দের কাছে সুবেদার মনছুর খাঁর সমাধি হিসেবে পরিচিত।

নিদাড়িয়া মসজিদকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, সুবেদার মনছুর খাঁর দাঁড়ি না থাকায় ফারসি শব্দের প্রভাবে মসজিদটির নাম হয় ‘নিদাড়িয়া’। যদিও এই ব্যাখ্যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও লোকমুখে এটি এখনও প্রচলিত। এ ছাড়া মসজিদটিকে ঘিরে আরও নানা ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনি স্থানীয়দের মুখে মুখে শোনা যায়।

ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, মসজিদের ব্যয় নির্বাহ ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ১০ একর ৫৬ শতক জমি ওয়াক্‌ফ হিসেবে দান করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে সেই সম্পত্তি মসজিদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, তাঁদের শৈশব থেকেই এই মসজিদ এলাকার মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। জুমা ও ঈদের সময় আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। অনেক দর্শনার্থী ইতিহাসের টানে এসে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ঘুরে দেখেন এবং এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

মসজিদের মুসল্লিরা জানান, প্রতিদিন নিয়মিত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মাহফিলে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। তাঁদের মতে, এই মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়; বরং লালমনিরহাটের ঐতিহাসিক পরিচয়েরও অংশ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, যথাযথ প্রচার, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো, তথ্যফলক স্থাপন এবং যোগাযোগব্যবস্থার আরও উন্নয়ন করা হলে নিদাড়িয়া মসজিদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

তবে সময়ের পরিক্রমা, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারে মসজিদের ছাদ ও দেয়ালের কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। যেহেতু এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনা, তাই অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের সংস্কার করা সম্ভব নয়। স্থানীয়দের দাবি, মূল স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে দ্রুত বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও সংস্কারকাজ শুরু করা প্রয়োজন, যাতে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদে সংরক্ষিত থাকে।

ইতিহাসবিদদের মতে, উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ইসলামি স্থাপত্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে নিদাড়িয়া মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর শিলালিপি, নির্মাণকৌশল এবং স্থাপত্য পরিকল্পনা মুঘল আমলের আঞ্চলিক স্থাপত্যের বিকাশ সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য বহন করে।

চার শতাব্দীর ইতিহাস, মুঘল স্থাপত্যের নান্দনিকতা, ধর্মীয় আবহ এবং স্থানীয় মানুষের আবেগ—সব মিলিয়ে নিদাড়িয়া মসজিদ আজ শুধু একটি প্রাচীন মসজিদ নয়; এটি লালমনিরহাটের গর্ব, উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে এই অমূল্য প্রত্নসম্পদকে টিকিয়ে রাখা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষীকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

একই রকম সংবাদ
© সকল স্বত্ব দৈনিক ঘোষণা অনলাইন ভার্শন কর্তৃক সংরক্ষিত
Site Customized By NewsTech.Com