গাজীপুরের কাশিমপুর থেকে শ্রীপুর ও জিরানীমুখী দুটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক দীর্ঘদিন ধরে দখল ও অব্যবস্থাপনায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সড়কের দুই পাশে ভাসমান দোকান বসিয়ে কোথাও কোথাও রাস্তার প্রায় অর্ধেক অংশ দখল করে নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যত্রতত্র ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখায় দিনের বড় একটি সময়জুড়েই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক প্রবেশ ও ছুটির সময় এবং স্কুল-কলেজ শুরু ও ছুটির সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার কথা বলে বিভিন্ন পয়েন্টে ইজিবাইক, অটোরিকশা, পিকআপ ও পণ্যবাহী গাড়ি থেকে টাকা আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ‘লাইন মেইনটেন্যান্স’ বা যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নামে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় পিকআপ, লরি কিংবা কোম্পানির পণ্যবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে কোনো কোনো স্থানে ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কাশিমপুর-শ্রীপুর আঞ্চলিক সড়কের ডিবিএল গার্মেন্টসের সামনের এলাকা থেকে কাজী মার্কেট, সুলতান মার্কেট, স্কয়ার গেট, হাজী মার্কেট ও মাদার টেক্সটাইল চৌরাস্তা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সড়কের দুই পাশে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। এসব দোকানের কারণে পথচারী ও যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলের জায়গা কমে গেছে। কোথাও দোকানের পসরা সড়কের ওপর পর্যন্ত চলে আসায় সরু অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে কাশিমপুর-জিরানী আঞ্চলিক সড়কের মাছিহাতা, পানিশাইল, হাতিমারা ঈদগাহ মাঠ, হাতিমারা কলেজ, মোল্লা মার্কেট, আলিম ফ্যাক্টরির সামনের সড়ক ও জিতারমোড়েও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব পয়েন্টে ভাসমান দোকান, যত্রতত্র অটোরিকশা ও ইজিবাইক দাঁড় করিয়ে রাখায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল হওয়ায় গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের যাতায়াতের সময় সড়ক দুটির ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একই সময়ে ইজিবাইক ও অটোরিকশার অতিরিক্ত উপস্থিতি এবং সড়কের পাশে দোকান বসানোয় যানজট দীর্ঘ হতে থাকে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী বহনকারী যানবাহনসহ সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহন থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সারদাগঞ্জের সুলতান মার্কেট এলাকায় নুরু নামের এক ব্যক্তি এবং মাদার টেক্সটাইল এলাকার চার রাস্তার মোড়কে কেন্দ্র করে রনি নামের একজন ‘লাইন মেইনটেন্যান্সের’ নামে টাকা আদায় করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নুরুর বাড়ি তাতিপাড়া এলাকায় এবং রনির বাড়ি মাদার টেক্সটাইল এলাকায়।
সড়ক ব্যবহারকারী যানবাহন চালকদের অভিযোগ, ইজিবাইক ও অটোরিকশার চালকদের কাছ থেকে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। পিকআপ, কোম্পানির বড় গাড়ি কিংবা লরির ক্ষেত্রে নেওয়া হয় আরও বেশি টাকা। স্থানীয়দের দাবি, এসব টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি রসিদ বা অনুমোদিত কাঠামো দেখা যায় না।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ধারণ করা একাধিক ভিডিওতেও যানবাহন থেকে টাকা আদায়ের দৃশ্য পাওয়া গেছে। তবে কার নির্দেশে বা কার অনুমতিতে এসব স্থানে টাকা আদায় করা হচ্ছে, সে বিষয়ে চালকদের অনেকেই স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি।তবে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে একটি রাজনৈতিক দলের কতিপয় সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের ও যানবাহন চালকদের দাবি,দিনের বেলা এসব লাইনম্যান নামের চাঁদাবাজদের উপস্থিতি দেখা না গেলেও সন্ধার পর পর যার যার নির্ধারিত স্থানে এসেই শুরু করে তাদের নিত্যদিনের চাঁদা আদায়। সড়কের পাশের দোকানিদের দাবি, সারাদিন দেখা না গেলেও চাঁদা আদায়ের আদর্শ সময় হিসেবে সন্ধার পরের সময়কেই বেছে নিয়েছেন এসব চাঁদাবাজরা।
এদিকে ডিবিএল গার্মেন্টসের সামনের এলাকায় বাঘু , শামীম, টুটুল ও টুটুলের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকান বসানোর পাশাপাশি এসব টাকা আদায়ের কারণে সড়কের পাশে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সড়কের ওপর দোকান বসানো এবং যানবাহন থেকে টাকা আদায়ের এই ব্যবস্থাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকারি সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সেখানে ব্যক্তিগতভাবে কেউ ‘লাইন মেইনটেন্যান্স’ বা অন্য কোনো নামে টাকা আদায়ের সুযোগ পাচ্ছে কীভাবে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু ইজিবাইক ও অটোরিকশাই নয় সড়কের দুই পাশে দোকান বসানো, যত্রতত্র যানবাহন দাঁড় করানো, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডের অভাব এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকাও যানজটের অন্যতম কারণ।
গার্মেন্টস ছুটির সময় কয়েকটি পয়েন্টে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও যানবাহন বের হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। একইভাবে সকালবেলা কারখানায় শ্রমিক প্রবেশ এবং স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সময়ও সড়কে চাপ বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে স্থায়ীভাবে সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করা না হলে সাময়িকভাবে দোকান সরিয়ে দিলেও কিছুদিন পর আবার একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ইজিবাইক ও অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও রুট ব্যবস্থাপনা না থাকায় যানজট স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা কাশিমপুর-শ্রীপুর ও কাশিমপুর-জিরানী আঞ্চলিক সড়কের দখলদারত্ব উচ্ছেদ, ভাসমান দোকান সরানো, যত্রতত্র ইজিবাইক-অটোরিকশা দাঁড় করানো বন্ধ এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করে নির্দিষ্ট স্থানে দোকান ও যানবাহনের ব্যবস্থা করা গেলে যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ‘লাইন মেইনটেন্যান্স’ কিংবা অন্য কোনো নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরতে পারে।
সড়ক দুটি কাশিমপুরের শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের এলাকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হওয়ায় দখল, যানজট ও টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক তদন্ত ও সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।