গ্যাস না থাকায় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। গোটা অর্থনীতি ও জনজীবনে জ্বালানিসংকটের ধাক্কা এসে লেগেছে। আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব অবকাঠামো থেকে গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল গভীর সমুদ্র পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সব প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের পর বাংলাদেশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও বাংলাদেশ তা করতে পারেনি। অথচ সমুদ্রের তেল-গ্যাস ব্লকগুলোর অধিকাংশই রয়েছে বাংলাদেশের সীমানায়।
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে জাহাজ দরকার তাও আমাদের নেই। আমরা ভাড়া করা ডিঙ্গি নৌকায় বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান করি। সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার যেতে পারি। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিই ভরসা। ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে শুধু উপকূলে কাজ করা যায়। আবার দিনেই ফিরে আসতে হয়। ফলে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। এজন্য ‘ওশান স্যাম্পল কালেক্টিং’ বোট ক্রয় করা জরুরি যার মাধ্যমে সমুদ্রে ১০০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থান করে ১০-১২ দিন থেকে সংগ্রহ করা যাবে তথ্য।
বঙ্গোপসাগর ও এর সংলগ্ন সমুদ্র অঞ্চল থেকে মিয়ানমার ও ভারত বিশাল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান ও উত্তোলন করেছে। মিয়ানমার তাদের সমুদ্র ব্লক ও রাখাইন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের তথ্য জানিয়েছে এবং সুই (Shwe) সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে নিয়মিত গ্যাস তুলছে। ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত গ্যাস উত্তোলন করে চীন ও অন্যান্য দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে রপ্তানি করা হচ্ছে। মিয়ানমার সম্প্রতি তাদের জলসীমায় নতুন করে প্রায় ৯৫ টিসিএফ (TCF) পরিমাণের বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা এই অঞ্চলে অন্যতম বৃহৎ প্রাপ্তি।
অন্যদিকে ভারত কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকা এবং আন্দামান সাগরসহ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন ব্লক থেকে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ভান্ডার থেকে গ্যাস উত্তোলন ও নতুন মজুদ নিশ্চিত করেছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড (OIL) আন্দামান সাগরের গভীর ও অতি গভীর সমুদ্রে ‘সমুদ্র মন্থন মিশন’-এর আওতায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সম্প্রতি আন্দামান ব্লকে কূপ খনন করে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।যা
তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ মেটাচ্ছে। নতুন করে গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন স্তরে আরও হাইড্রোকার্বনের মজুত খুঁজতে সমীক্ষা ও খনন কাজ চলছে। ওএনজিসি-এর প্রধান ব্লক (KG-DWN-98/2) থেকে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৮,০০০ থেকে ৩৩,০০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) উৎপাদিত হচ্ছে এবং প্রায় ২.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার (mmscmd) গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই একটি ব্লক থেকেই গ্যাস উৎপাদন দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ মিলিয়ন ঘনমিটারে (mmscmd) পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।এই পুরো অববাহিকার লাইফটাইম বা মেয়াদকালে মোট ৫০.৭ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (bcm) গ্যাস এবং ২৩.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল উত্তোলনের প্রাক্কলন করেছে ভারত।
ভারত সরকার ত্রিপুরা থেকে প্রায় ১৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার আশা করছে।ত্রিপুরার সঙ্গে আমাদের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অনেক মিল রয়েছে। তারা যদি অনুসন্ধান শুরু করে সফল হতে পারে, তাহলে আমাদের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলেও গ্যাস সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।বাংলাদেশ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সমুদ্র এলাকাকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি অগভীর এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। কিন্তু ধারাবাহিকতা না থাকায় অনুসন্ধানে গতি আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্র্রভিত্তিক তেল-গ্যাস কোম্পানি কনোকো ফিলিপস ২০০৮ মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুসরণে ঘোষিত বিডিং রাউন্ডের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের ব্লক ডিএস-১০ ও ডিএস ১১ এর জন্য কনোকোফিলিপস এর সঙ্গে একটি পিএসসি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু আর্থিক শর্তাবলী তাদের বিবেচনায় অনুকূল না হওয়ায় ২০১৫ সালে তারা ব্লক দুটি ছেড়ে দেয়।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে ডাকা অন্য একটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ এই তিন ব্লকের জন্য যৌথভাবে দরপ্রস্তাব জমা দিয়েছিল কনোকো ও স্টেট ওয়েল। পরে কনোকো নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় ব্লকগুলো ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি।আশার কথা বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে ঘোষণা করা ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ এর আওতায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানির জন্য ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক উন্মুক্ত করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
তেল গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের বিষয় কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। প্রথমত সমুদ্রে কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজ, রিগ, লগিং বা অন্যান্য কাজের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের জায়গায় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্স এবং পেট্রোবাংলার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।এসব প্রতিষ্ঠানকে যখন সম্পৃক্ত করা হবে, কাজ করার সুযোগ দেবে, এরা তখন নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বিদেশে চলে যাওয়া অভিজ্ঞ বাংলাদেশি জ্বালানি বিশেষজ্ঞদেরও ফিরিয়ে আনতে হবে।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যান দেখলে, এখন প্রতি ৮ থেকে ১০টি কূপ খনন করে একটি কূপে সফলতা পাওয়ার হারকে মোটামুটি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। বাংলাদেশে এই সফলতার হার প্রায় ৩:১। তাই ব্যর্থতার আশঙ্কায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
জাতীয় খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করতে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক সফটওয়্যার, রিগ ও ড্রিলিং প্রযুক্তি এবং দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সিসমিক ডেটা সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।