1. masudkhan89@yahoo.com : Ghoshana Desk :
  2. zunayedafif18@gmail.com : Mahir Al Mahbub : Mahir Al Mahbub
  3. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
পরীক্ষা নাকি শিক্ষার্থীর জীবন- রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কোনটি? - দৈনিক ঘোষণা
ব্রেকিং নিউজ :
নলছিটিতে জমি লিখে না দেওয়ায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে মারধর, ছেলে গ্রেফতার পেকুয়ায় থামছেই’না বাইক দূর্ঘটনা! অকালে ঝড়ে যুবকের প্রাণ লালমনিরহাটে সমবায় অফিসে এলাহী কাণ্ড, সরকারি কক্ষে পাতা বিছানা, হাজিরা খাতা নিয়ে লুকোচুরি ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন: ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক কেউ খোঁজ নেয়নি, শফিউল আলম বাদশা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন: পটিয়ার ২,৫০০ বন্যার্ত পরিবারের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার কথা ঘোড়াঘাটে মৃত্তিকা মোহন্ত ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে ফটিকছড়িতে বন্যা কবলিত এলাকার এক হাজার পরিবারকে প্রত্যাশীর ত্রাণ সহায়তা প্রদান ভালুকায় চাঁদা না দেওয়ায় বৃদ্ধার নামে ষড়যন্ত্রমোলক মামলা,ন্যায় বিচার বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা ময়মনসিংহে জুলাই শহিদ দিবস পালন উপলক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা সারুলিয়া বাবুর্চি একতা সমিতির সহ-সভাপতি মোঃ রফিকুল ইসলাম বাবুর্চির শোকসভা

পরীক্ষা নাকি শিক্ষার্থীর জীবন- রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কোনটি?

reporter ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
calendar প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করে না; এটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, মানবিকতা এবং জবাবদিহিকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। সাম্প্রতিক এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আবারও সেই মৌলিক প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে- সংকটের সময় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত: নির্ধারিত সময়সূচি, নাকি শিক্ষার্থীর জীবন ও নিরাপত্তা?

বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষা কেবল একটি শিক্ষাগত মূল্যায়ন নয়; এটি লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের বহু বছরের পরিশ্রম, স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি পরীক্ষার ফলাফল উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, পেশাগত জীবন এবং ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ফলে এই পরীক্ষা পরিচালনা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একই সঙ্গে মানবিক, নৈতিক এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বিষয়।

সম্প্রতি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা প্রশ্ন তুলেছেন- যখন কোথাও বন্যা, কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বা আংশিক ভেঙে পড়েছে, তখন দেশের সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আদৌ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে কি?

শিক্ষার্থীদের দাবির মূল বিষয় ছিল তিনটি- দুর্যোগের কারণে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ; ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা পুনর্বিবেচনা; এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও এসব কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন, তবুও এগুলোকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো শিক্ষা প্রশাসনের প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থাহীনতারও একটি বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় পরীক্ষা গ্রহণে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও সরকার দাবি করেছে। একটি জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তথ্যের ওপর নির্ভর করাই স্বাভাবিক। তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে- প্রশাসনিক মূল্যায়ন কি সব সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা পুরোপুরি প্রতিফলিত করে?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এমন যে একই জেলার এক অংশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকলেও অন্য অংশ সম্পূর্ণ পানিবন্দী হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো পরীক্ষার্থীকে নৌকায়, ভ্যানে কিংবা কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়। কোথাও সেতু ভেঙে যায়, কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে জেলা বা উপজেলার গড় পরিস্থিতি একজন পরীক্ষার্থীর প্রকৃত দুর্ভোগকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে। নীতিনির্ধারণে এই বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সমান সুযোগের নীতি। পাবলিক পরীক্ষার মৌলিক দর্শন হলো, সব পরীক্ষার্থী যেন সমান পরিবেশে মূল্যায়নের সুযোগ পায়। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারে, আর অন্যজন কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষাকেন্দ্রেই পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সেই মূল্যায়ন কতটা ন্যায্য- এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করে। যদিও পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে সংবিধানে আলাদা কোনো বিধান নেই, তবুও রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তে বৈষম্যহীন সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক চেতনা প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই দিনের পরীক্ষায় মোট ১৯ হাজার ৫৯২ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। অবশ্য এই অনুপস্থিতির সব কারণই যে বন্যা বা দুর্যোগ, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। অসুস্থতা, ব্যক্তিগত কারণ কিংবা অন্যান্য কারণও থাকতে পারে। তাই প্রকৃতপক্ষে কতজন শিক্ষার্থী দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা দিতে পারেননি, সে বিষয়ে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন জরুরি। জনআস্থা গড়ে ওঠে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর, অনুমানের ওপর নয়।

এরই মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার একটি প্রশ্ন নিয়ে বিতর্কের পর আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি প্রয়োজনে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসন প্রয়োজনীয় নমনীয়তা প্রদর্শন করতে সক্ষম। একই ধরনের মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে অতীতেও বন্যার কারণে অঞ্চলভিত্তিকভাবে পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত করার নজির রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ দেশও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় পরীক্ষা পুনর্নির্ধারণ, বিকল্প মূল্যায়ন কিংবা বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা গুরুত্বপূর্ণ; তবে তা কখনোই শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।

অবশ্য একটি জাতীয় পরীক্ষা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, কেন্দ্র পরিচালনা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফল প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি- সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানবিক, নমনীয় ও দূরদর্শী সমাধান খুঁজে বের করাই দক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয়।

এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট- বাংলাদেশে দুর্যোগকালীন পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি স্থায়ী, সুস্পষ্ট এবং আইনসম্মত জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন। কোন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত হবে, কোথায় অঞ্চলভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে, কীভাবে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা হবে এবং কীভাবে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত জানানো হবে- এসব বিষয়ে আগাম নির্দেশনা থাকলে ভবিষ্যতে এমন বিতর্ক অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যব্যবস্থা, রিয়েল-টাইম ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ জনসংযোগব্যবস্থা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

শিক্ষার্থীদের প্রতিও প্রত্যাশা রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। তবে এমন কর্মসূচি, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল, জরুরি সেবা বা অন্য নাগরিকের অধিকার ব্যাহত হয়, তা শেষ পর্যন্ত ন্যায্য দাবির নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে। যুক্তি, তথ্য এবং শান্তিপূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণই গণতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি প্রশ্নই থেকে যায়- সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্র কি প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিরাপদ ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেরেছে? এই প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল নিয়ম প্রয়োগে নয়; বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং দূরদর্শিতার সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায়। একটি পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন করা যায়, একটি একাডেমিক ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাস করা যায়; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একটি জীবন, ভেঙে যাওয়া একটি স্বপ্ন কিংবা একটি প্রজন্মের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না।

সেই কারণেই ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি, যেখানে প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানবিকতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি মানুষের জন্য; আর শিক্ষা মানুষের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার মাধ্যম। পরীক্ষা সেই পথের একটি ধাপ মাত্র- মানুষ কখনোই পরীক্ষার চেয়ে ছোট নয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

একই রকম সংবাদ
© সকল স্বত্ব দৈনিক ঘোষণা অনলাইন ভার্শন কর্তৃক সংরক্ষিত
Site Customized By NewsTech.Com