কক্সবাজারের চকরিয়ায় শেভরণ হাসপাতালে প্রসূতি জান্নাতুল মাওয়া লুচির মৃত্যুকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, রক্ত সঞ্চালনের পর হঠাৎ রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি কেন হলো, সংকটের মুহূর্তে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের পাশাপাশি এবার সামনে এসেছে হাসপাতালটির লাইসেন্স ও বিভিন্ন সরকারি অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা।
ঘটনার চার দিন পর কর্তব্যরত চিকিৎসকের মাধ্যমে হাসপাতালের পক্ষ থেকে বিস্তারিত চিকিৎসাবিষয়ক ব্যাখ্যা দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের স্বজনরা। তাদের প্রশ্ন—“ভুল যদি না-ই থাকে, তাহলে ঘটনার দিন সংকটের মুহূর্তে চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষ কোথায় ছিলেন?”
গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) শেভরণ হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর ২২ বছর বয়সী জান্নাতুল মাওয়া লুচির মৃত্যু হয়। তিনি চকরিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শেফায়েত মাসুমের স্ত্রী।
স্বজনদের দাবি, ওইদিন দুপুর পর্যন্ত লুচি স্বাভাবিক ছিলেন। অনাগত সন্তানকে ঘিরে পরিবারের মধ্যে ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশা। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে রক্ত দেওয়া শুরু হলে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে তীব্র খিঁচুনি শুরু হয়। দ্রুত অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যার দিকে তার মৃত্যু হয়।
রক্ত দেওয়ার পরই কেন এমন অবনতি?নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, রক্ত দেওয়ার পরপরই লুচির শরীরে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুরু হয় তীব্র খিঁচুনি এবং দ্রুত অবনতি ঘটে তার শারীরিক অবস্থার।
স্বজনদের আরও অভিযোগ, মৃত্যুর পর রোগীকে দেওয়া রক্তের ব্যবহৃত ব্লাড ব্যাগ দেখতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে বা হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি। এতে তাদের সন্দেহ ও ক্ষোভ আরও বাড়ে।তবে রক্ত সঞ্চালনের সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা চিকিৎসা নথি, রক্তের নমুনা ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সংকটের সময় চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষ কোথায়? স্বজনদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অনিয়ম না হয়ে থাকলে রোগীর অবস্থা সংকটজনক হওয়ার পর হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল?
পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর পর হাসপাতালের অফিস বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরে যান। এমনকি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তারা।স্বজনদের ভাষ্য, মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরে নানা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেয়ে সংকটের মুহূর্তে রোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই ছিল বেশি জরুরি। তাদের অভিযোগ, সেই সময় প্রয়োজনীয় মানবিক সহযোগিতা ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
চার দিন পর চিকিৎসকের ব্যাখ্যা, প্রশ্নের শেষ কোথায়?ঘটনার কয়েক দিন পর কর্তব্যরত চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসায় নিহতের স্বজনদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।তাদের সরাসরি প্রশ্ন—“ভুল যদি না-ই থাকে, সেদিন পালিয়েছিলেন কেন?”স্বজনদের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি শুরু থেকেই মনে করে থাকে চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হয়নি, তাহলে মৃত্যুর পরপরই পরিবারের সামনে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট করা উচিত ছিল।তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় নীরব থাকা এবং চার দিন পর ব্যাখ্যা দেওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রশাসনের অভিযানে ৭০ হাজার টাকা জরিমানাপ্রসূতির মৃত্যুর পরদিন শনিবার (২৯ আগস্ট) উপজেলা প্রশাসন শেভরণ হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শফিউল আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে হাসপাতালের লাইসেন্স, চিকিৎসক-নার্সের উপস্থিতি, পরিচালনার অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিষয় পরিদর্শন করা হয়।অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় বলে জানা গেছে।এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শন ও মোবাইল কোর্টের অভিযানেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ও জরিমানার তথ্য সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স নবায়ন আছে তো?এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শেভরণ হাসপাতালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা কী?অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদনের কিছু কাগজপত্র যথাযথভাবে নবায়ন করা হয়নি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের হালনাগাদ নথি যাচাই প্রয়োজন।যদি কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে থাকে, তাহলে সেই অবস্থায় কীভাবে রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে—এ প্রশ্নের উত্তর চায় স্থানীয়রা।
ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র কোথায়?হাসপাতালের মতো জনসমাগমপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্নিনিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেভরণ হাসপাতালের ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র বা সনদের বর্তমান মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সনদ নবায়ন না থাকলে রোগী, স্বজন ও কর্মীদের অগ্নিঝুঁকি কতটা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কীভাবে দেখছে—তা তদন্তের দাবি উঠেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কাগজপত্রও প্রশ্নের মুখেহাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ছাড়পত্রের নবায়ন নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।
হাসপাতাল থেকে উৎপন্ন মেডিকেল বর্জ্য যথাযথ নিয়মে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে কি না, পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ কতদিন এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।এত প্রশ্নের পরও হাসপাতাল চলছে কীভাবে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যদি সত্যিই কোনো ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—এত অনিয়মের অভিযোগের পরও শেভরণ হাসপাতাল কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে?আগেও পরিদর্শন, নির্দেশনা ও জরিমানার ঘটনা থাকলে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, “প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র যদি নবায়ন না থাকে, তাহলে কার ইশারায় চলছে শেভরণ হাসপাতাল?”তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সব কাগজপত্র বৈধ ও হালনাগাদ থাকলে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সামনে সেগুলো উপস্থাপন করে অভিযোগের অবসান ঘটানো সম্ভব বলেও মনে করছেন অনেকে।
লুচির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিজান্নাতুল মাওয়া লুচির মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, রক্ত সঞ্চালন যথাযথ নিয়মে হয়েছিল কি না, অপারেশনের আগে ও পরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও সহায়ক জনবল উপস্থিত ছিলেন কি না এবং সংকটের মুহূর্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়।
একই সঙ্গে হাসপাতালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও যাচাই করার দাবি উঠেছে।নিহতের স্বজনদের দাবি, হাসপাতালের নিজস্ব ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। চিকিৎসা নথি, অপারেশন রেকর্ড, রক্ত সঞ্চালনের তথ্য, ব্যবহৃত ব্লাড ব্যাগ, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে হবে।
কারণ, চিকিৎসাশাস্ত্রের কঠিন পরিভাষায় একটি মৃত্যুর ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু স্বজন হারানোর শূন্যতা কোনো ব্যাখ্যায় পূরণ হয় না।