জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) থেকে দুর্নীতির দায়ে অপসারিত হয়েও থেমে থাকেনি তার বেপরোয়া অপকর্ম। সমিতির সাধারণ কিংবা বৈধ কোনো সদস্যের অনুমোদন বা দাবির প্রেক্ষিতে নয়, বরং সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের দাপট ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কাফরুলের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র প্রশাসক পদটি বাগিয়ে নেন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফা। সাধারণ সদস্যদের চরম উপেক্ষা করে ও সাধারণ সভার কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বসানো এই বিতর্কিত প্রশাসক চেয়ারে বসেই মেতে উঠেছেন সদস্যদের কষ্টার্জিত সমিতির তহবিলে গচ্ছিত অর্থ লুটপাট, নজিরবিহীন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অধিবাসীদের শত কোটি টাকার আবাসন দখলের ভয়াবহ মাফিয়া চক্রান্তে।
অনুসন্ধান ও সমাজসেবা অধিদপ্তরে দাখিলকৃত অফিশিয়াল দাপ্তরিক অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রশাসকের আসনে বসেই উলফা সাধারণ সদস্যদের কোনো রূপ অনুমোদন ছাড়াই সদস্যদের কষ্টার্জিত সমিতির তহবিলে গচ্ছিত অর্থ প্রতিনিয়ত বেআইনিভাবে তুলে তসরুফ করতে শুরু করেন। অনিয়মের এই বেপরোয়া তাণ্ডব বন্ধে পরবর্তীতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশন (নং- ২২৩৪২/২০২৫)-এর আদেশে গত ০৭/০৭/২০২৬ তারিখে সমিতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনে স্পষ্ট ও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু মহামান্য হাইকোর্টের সেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং আদালতের প্রতি চরম অবমাননা প্রদর্শন করে তিনি ক্ষমতার দাপটে অর্থ উত্তোলন অব্যাহত রাখেন। আদেশ অমান্য করে ০৭/০৭/২০২৬ থেকে ২২/০৭/২০২৬ তারিখের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আরও ২৪.৮০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়া হয়। আদালতের কড়া নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে ও নিয়োগের শর্ত সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে তিনি এ পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এই ভয়াবহ আর্থিক দুর্নীতি ও সাধারণ সদস্যদের অনুমোদনবিহীন অন্যায় প্রশাসনিক নিয়োগের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সমিতির মূল সদস্যরা রাজপথে নেমে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরে লিখিত দাপ্তরিক অভিযোগ দাখিল করেন। তবে ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সমাজসেবা অধিদপ্তরের একশ্রেণীর অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে নিজের পদ টিকিয়ে রাখার অপকৌশল নেন উলফা। ফলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দূরের কথা, উল্টো ১ এপ্রিল জারি করা এক বিতর্কিত আদেশে (স্মারক: ৪১.০০.০০০০.০০০.০৮৬.২৭.০০১৬.২৮.১৯) তাকে ‘পরিচালকমণ্ডলীর সমকক্ষ’ একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়, যা দিয়ে তিনি প্রতিবাদী সদস্যদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে সব নিয়ম ভেঙে সমাজসেবা অধিদপ্তর তাকে স্বপদে বহাল রাখে এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর পুনরায় কয়েক দফায় তার মেয়াদ বৃদ্ধি করে। সর্বশেষ গত ২৬/০৭/২০২৬ তারিখে জারি করা এক আদেশে (স্মারক নম্বর: ৪১.০০.০০০০.০০০.০৮৬.২৭.০০১৬.২৮.৫৪৭) তাকে পুনরায় আরও ৬ মাসের জন্য প্রশাসকের পদে বহাল রেখে মেয়াদ বর্ধিত করে দপ্তরটি।
প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে উলফা এবার নজর দেন সদস্যদের নিবন্ধিত ফ্ল্যাটের ওপর। নামজারি সম্পন্ন ও নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধিত কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বেআইনিভাবে দখলের নগ্ন পাঁয়তারা শুরু করেন তিনি। স্থানীয় অপরাধী চক্র ও নেপথ্যে থাকা আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘রাকিন’-এর প্রত্যক্ষ মদদে বিজয় রাকিন সিটিতে একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এর ধারাবাহিকতায় গত ১ আগস্ট বৈধ ফ্ল্যাটসমূহ গায়ের জোরে দখলের উদ্দেশ্যে একদল বহিরাগত সশস্ত্র সন্ত্রাসী নিয়ে প্রকাশ্যে তাণ্ডব ও হামলা চালানো হয়, যা পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে এই ন্যক্কারজনক হামলার পর সিটির সর্বস্তরের সাধারণ বাসিন্দারা ভয়ভীতি পেছনে ফেলে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অধিবাসীদের এই চরম প্রতিরোধ এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পুলিশ বাহিনীর সময়োপযোগী সহযোগিতা ও অধিবাসীদের এই অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখেই শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের বড় ধরনের তাণ্ডব ও দখলদারির চক্রান্ত সম্পূর্ণ ভেস্তে যায় এবং বাসিন্দারা মারাত্মক সংঘাত থেকে রেহাই পান।
১ আগস্টের সন্ত্রাসী তাণ্ডব ভেস্তে যাওয়ার পর গত ৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ক্ষমতার চরম অহংকার প্রদর্শন করেন উলফা। ঐ দিন তিনি সমিতির কয়েকজন সাধারণ সদস্যকে কার্যালয়ে ডেকে এনে অবরুদ্ধ পরিবেশে মানসিক নির্যাতন করেন এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক ইস্যুকৃত ১ই এপ্রিলের বিতর্কিত পত্রটি সামনে দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে সদস্যপদ চিরতরে বাতিল ও ফ্ল্যাট থেকে উচ্ছেদের চরম হুমকি দেন। একই সাথে নিজের অপকর্ম ও সন্ত্রাসী হামলা ধামাচাপা দিতে ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের ব্যাকডেটে একটি পরম ধোঁকাবাজিমূলক ‘মতবিনিময় সভার বিজ্ঞপ্তি’ (সূত্র: মুমুকস/প্রশাসক/২০২৬/১৩২) প্রকাশ করেন। চিঠিতে বিজয় রাকিন সিটির ৮৭০টি বৈধ ফ্ল্যাটের মালিকদের লক্ষ্য করে আগামী ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা মূলত ফ্ল্যাট মালিকদের ব্ল্যাকমেইল ও মানসিক গোলামিতে বাধ্য করার এক পরিকল্পিত দাপ্তরিক মহড়া।
উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে নিয়মিত ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ, সাধারণ সদস্যদের অনুমোদন ও দাবি ছাড়াই সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে নিয়োগ ও বারবার বেআইনিভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি, ১ আগস্টের প্রকাশ্য সন্ত্রাসী হামলা এবং জালিয়াতিপূর্ণ নোটিশের আড়ালে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পর সাধারণ সদস্য ও অধিবাসীদের মাঝে ক্ষোভের অগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ ঘটেছে। শত ভয়ভীতি ও প্রশাসনিক অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে সাধারণ সদস্যরা আজ দীর্ঘ সংগ্রামের রাজপথে নেমে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এর আগেও একাধিকবার এই দুর্নীতিবাজ প্রশাসককে অপসারণ করে সমিতির নির্বাচিত কমিটির নিকট দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য সমাজসেবা দপ্তরে লিখিত আবেদন জানানো হয়, কিন্তু রহস্যজনক কারণে দপ্তরটি তা কোনো আমলেই নেয়নি। সর্বশেষ গত ০৪/০৮/২০২৬ তারিখে সমিতির পক্ষ থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পুনরায় লিখিত চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়—সমিতিতে স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখা, স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং সদস্যদের কষ্টার্জিত সমিতির তহবিলে অর্থ ও সাধারণ সদস্যদের সার্বিক স্বার্থ সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে অনতিবিলম্বে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নানাবিধ অনিয়মের সাথে জড়িত দুর্নীতিবাজ ইশতিয়াক আজিজ উলফাকে বরখাস্ত করে সমিতির নির্বাচিত কমিটির নিকট দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের প্রতি আস্থা রেখে বিজয় রাকিন সিটির অধিবাসীরা একযোগে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উলফার এই অশুভ আঁতাত অবিলম্বে ভাঙতে হবে। তারা দ্রুত ইশতিয়াক আজিজ উলফার বিতর্কিত প্রশাসনিক ক্ষমতা বাতিল, তাকে প্রশাসক পদ থেকে বরখাস্ত করে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা এবং স্থায়ীভাবে বাসিন্দাদের আবাসন ও জীবনের নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।