নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের আইনি ও সামাজিক সেবা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে কক্সবাজারে একটি অ্যাডভোকেসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের সহযোগিতায় মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে কক্সবাজার ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
ব্র্যাক জেলা সমন্বয়ক অজিত নন্দীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের শুরুতেই মূল আলোচনার বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন ব্র্যাক জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের রিজিওনাল ম্যানেজার ফারহানা ইসলাম। তিনি একটি তথ্যবহুল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলায় নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক জরিপের ফলাফল, বিদ্যমান সরকারি সেবাসমূহ এবং সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। একই সাথে তিনি সারভাইভারদের (সহিংসতার শিকার) জন্য দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে যৌথ উদ্যোগের রূপরেখা প্রস্তাব করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কক্সবাজার জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এর উপপরিচালক সুব্রত বিশ্বাস বলেন, “নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার থেকেও কন্যা শিশুর প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হবে।” ভুক্তভোগীরা যাতে সহজে ও দ্রুত সেবা পান, সেজন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় এর সহকারী পরিচালক আব্দুল আওয়াল বলেন, “সহিংসতার হার কমাতে হলে মানুষের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে সহিংসতার ঘটনা মোকাবিলায় এনজিওগুলোর কাজের সাথে সরকারি সেবার সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে।”
ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রাম দাবির রিজিওনাল ম্যানেজার মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “যারা সরাসরি সেবাদান প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত, সেই মাঠকর্মীদের আচরণগতভাবে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। এজন্য কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।”
ব্র্যাকের হিউমেনিটেরিয়ান ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (HCMP) জেলা সমন্বয়ক মোঃ আবুল কাহহার যুবসমাজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, “তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক মূল্যবোধ ও সচেতনতা তৈরি করতে পারলে সহিংসতা প্রতিরোধ সহজ হবে। এই লড়াইয়ে যুবসমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে।”
সেলপ কর্মসূচির জেলা ব্যবস্থাপক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “সরকার নারী ও শিশুদের জন্য অনেক ভালো সেবা চালু রেখেছে। সাধারণ মানুষের মাঝে এসব সেবার প্রচার বাড়াতে পারলে ভুক্তভোগীরা সহজে সুবিধা পাবেন। একই সাথে প্রযুক্তিকে অপরাধের মাধ্যম না বানিয়ে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে হবে।”
মুক্ত আলোচনা পর্বে উপস্থিত ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচির জেলা প্রধান, স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা কক্সবাজার জেলায় নারী, কিশোরী ও কন্যাশিশুদের বর্তমান অনিরাপদ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বক্তারা জানান, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে বর্তমানে নারী ও শিশুরা নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
আলোচকরা একমত হন যে, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা রুখতে হলে সবার আগে মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। একই সাথে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরে অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিকদের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে কার্যকর সামাজিক আন্দোলন ও কমিউনিটিভিত্তিক ক্লাব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে ডায়ালগটি সম্পন্ন হয়।