কক্সবাজারের রামু থানায় নতুন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক এ.কে.এম. ফজলুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পর থানার কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের অনেকে। মাদকবিরোধী অভিযান, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং থানায় দালালনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি পুলিশি সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাঠপর্যায়ের পুলিশি কার্যক্রমে গুরুত্ব দিচ্ছেন ওসি এ.কে.এম. ফজলুল হক। বিশেষ করে রামুর দুর্গম ও অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গর্জনিয়া ও ঈদগড় পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে মাদক, সন্ত্রাস, চোরাচালান, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।মাদক ও সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধে নজররামু উপজেলার গর্জনিয়া ও ঈদগড়সহ কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব এলাকায় মাদক কারবারি ও চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি এবং অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসব এলাকায় অপরাধীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়ির অভিযানে কয়েক দফা ইয়াবার বড় চালান উদ্ধারের ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত অভিযান ও পুলিশি তৎপরতা বাড়ায় মাদক কারবারিদের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ডাকাতি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।
বিট পুলিশিংয়ে জনগণের কাছে পুলিশ:অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু অভিযান চালানোর পরিবর্তে অপরাধ প্রতিরোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিট পুলিশিং সভার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।এসব সভায় মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর অপরাধ, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছ থেকে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পুলিশকে দ্রুত জানাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পুলিশ কর্মকর্তাদের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়াচ্ছে।একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলেন, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ যত বাড়বে, অপরাধ প্রতিরোধ তত সহজ হবে। ছোট কোনো ঘটনা বড় আকার ধারণ করার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।‘দালালমুক্ত’ সেবার বার্তারামু থানায় সেবা নিতে আসা মানুষকে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা কথিত দালালের মাধ্যমে নয়, সরাসরি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।মামলা, সাধারণ ডায়েরি বা অন্য কোনো অভিযোগ নিয়ে থানায় আসা ব্যক্তিদের কথা সরাসরি শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের একটি অংশ বলছে, থানায় সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়লে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা কমে। বিশেষ করে অভিযোগ বা মামলা করতে গিয়ে কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে না হওয়া পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে।একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “পুলিশি সেবা পেতে যদি কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর প্রয়োজন না হয় এবং মানুষ সরাসরি নিজের কথা বলতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য সেটি অবশ্যই স্বস্তির বিষয়।”
তবে পুলিশের এই পরিবর্তিত কার্যক্রমে থানাকেন্দ্রিক পুরোনো সুবিধাভোগী কিছু মহল অসন্তুষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন ওসির কঠোর অবস্থান এবং দালালনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের কারণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করছে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পুলিশি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।তাদের মতে, একজন পুলিশ কর্মকর্তার কার্যক্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর দায়িত্ব পালনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকার ভিত্তিতে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ:রামুর মতো বিস্তৃত ও ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় একটি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চল এবং মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকি পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মাদকবিরোধী অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা, ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধ এবং সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ দমনের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “পুলিশের ভালো উদ্যোগের ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় এবং অপরাধী যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়।”
দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা, জনসম্পৃক্ততা এবং অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কারণে রামু থানার ওসি এ.কে.এম. ফজলুল হক স্থানীয়দের একটি অংশের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।তবে এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখার আসল পরীক্ষা এখন সামনে। অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পুলিশি সেবায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিটি অভিযোগের যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারলেই রামু থানার এই পরিবর্তনের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী আস্থা অর্জন করবে।