যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশে পালিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬। জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও চেতনাকে ধারণ, তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা বিকাশ এবং একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যের ভূমিকা তুলে ধরতে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবন-৩-এ ‘তোমার দৃষ্টিতে জুলাই-২০২৪ আন্দোলন’ শীর্ষক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দিবসটির প্রথম পর্ব শুরু হয়। এতে শাহজাদপুরের বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘ঐক্যবদ্ধ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে তারুণ্যের ভাবনা’ শীর্ষক বিতর্ক ও রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিতর্ক, রচনা ও চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
দিবসটির দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় বিকেল ৩টায় ‘৩৬ জুলাই’ বিষয়ক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। এরপর ‘ঐক্যবদ্ধ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে তারুণ্যের ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতারের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সোবাহান ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী শহীদ ও আহতদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। শহীদ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ জাতির জন্য গভীর শ্রদ্ধার বিষয়। শহীদদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ, সৃজনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, সৃজনশীল খাতের বিকাশ, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ, বৃত্তি তহবিল এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা পূরণে শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগই দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অ্যাকাডেমিয়া ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ ও বাস্তব কর্মঅভিজ্ঞতার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে তারা কর্মবাজারের জন্য আরও দক্ষ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ইউজিসির এই সদস্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো ও সামগ্রিক উন্নয়নে ইউজিসির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতারের নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাঁর নেতৃত্বে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও এগিয়ে যাবে।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণ প্রজন্মের সাহস, আত্মত্যাগ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই গণঅভ্যুত্থান অন্যায়, বৈষম্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তরুণদের সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তবে দেশ ও জাতি গঠনে সব দল-মত যদি ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তাহলেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের আত্মত্যাগের ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করা সম্ভব হবে। তরুণদের মেধা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকেই নিতে হবে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের, আধুনিক ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার, শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শিল্প ও সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সোবাহান ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনা সভায় জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা নিয়ে নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। এ সময় গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিচারণ করেন এবং আহত শিক্ষার্থীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে উপজীব্য করে একটি নাটিকা পরিবেশিত হয়।
দিনটির তৃতীয় পর্বে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, স্টার্টআপ ও ইনোভেশন কার্যক্রম গতিশীল করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে অংশীজনদের নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও শিল্পখাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ মিল্কভিটা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক), যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিরাজগঞ্জ), মতিন এগ্রো ফার্ম ও জামান ডেইরি ফার্মের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সঙ্গে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়।
দিনব্যাপী আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা ছাড়াও শাহজাদপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।