আর এ লায়ন সরকার, নরসিংদী: গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা, যেখানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী আইন মেনে জনগণের ভোট ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে—নিবন্ধিত দলের তুলনায় অনিবন্ধিত দল ও গোষ্ঠীর দাপট ক্রমশ বেড়ে চলেছে। তাদের সহিংসতা, উগ্র কর্মকাণ্ড এবং নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপ ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে দিশেহারা করে তুলছে।
মূল আলোচনা:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে কাজ করে। তাদের ওপর সংবিধান, নির্বাচনী বিধি এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু এর বাইরে অনিবন্ধিত বহু রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছে—কিছু ধর্মভিত্তিক, কিছু আঞ্চলিক, আবার কিছু চিহ্নহীন শক্তি, যারা মাঠ দখল করতে আইন ও বিধির তোয়াক্কা করে না। এরা বিভিন্ন সময়ে সহিংস আন্দোলন, অবরোধ, রাস্তা বন্ধ, গুজব ছড়ানো, এমনকি সশস্ত্র সংঘর্ষের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৪-২৫) জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। অনিবন্ধিত গোষ্ঠীগুলোর অবরোধ, হরতাল ও সহিংস কর্মসূচিতে সরকারি যানবাহন ও অফিস ভাঙচুর, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এবং জনসাধারণের ভোগান্তি বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার ধস—সব মিলিয়ে একটি আতঙ্কগ্রস্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনী মাঠে আইন মেনে প্রতিযোগিতা করছে, তখন অনিবন্ধিত গোষ্ঠীর দাপট তাদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত করছে এবং রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
ভবিষ্যতের আশঙ্কা:
যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, আইনের শাসন নড়বড়ে হয়ে পড়বে, আর জনগণ ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা হারাবে। অনিবন্ধিত গোষ্ঠীর প্রভাবের ফলে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি বাড়বে, যা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় অনিবন্ধিত রাজনৈতিক শক্তির অযৌক্তিক দাপট বন্ধ করা জরুরি। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের উচিত কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপ, সমঝোতা ও একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্রের আসল শক্তি প্রতিশোধে নয়, বরং জনগণের কল্যাণে কাজ করার মধ্যে নিহিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এখনই হিংসা-অস্থিরতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
Leave a Reply