ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট। একসময় শীতের শেষে যে সীমান্তে মাইলের পর মাইল সবুজ পাতায় ঢেকে থাকত তরমুজের খেত, আজ সেখানে কেবলই ধানখেতের ধোঁয়াটে ধূসরতা। বিগত ৫-১০ বছর ধরে টানা বোরো ধান চাষ করতে গিয়ে একের পর এক লোকসানের মুখে পড়ছেন এই অঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা হাজারো কৃষক। একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে বোরো ধানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। লোকসানের এই বৃত্ত থেকে বের হতে কৃষকেরা এখন আবারও তাঁদের সেই পুরোনো 'সোনালী ফসল'—তরমুজ চাষে ফিরে যেতে চান।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক দশক আগেও হালুয়াঘাটের ধারা, ধোবাউড়া সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা এবং পাশের নড়াইল, জুঁইকুড়া এলাকার উর্বর বেলে-দোআঁশ মাটিতে বিপুল পরিমাণে তরমুজ চাষ হতো। এখানকার উৎপাদিত তরমুজ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হতো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। কম সময়, নামমাত্র খরচ আর অল্প পরিশ্রমে মিলত দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ লাভ।
সীমান্ত এলাকার একাধিক প্রবীণ ও তরুণ কৃষকের কণ্ঠে আক্ষেপের সুর। স্থানীয় কৃষক রহিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “আগে আমরা বোরো ধানের চেয়ে তরমুজ চাষ কইরা বেশি লাভবান হইতাম। ধান লাগাইয়া সার-ডিজেলের দাম তোলতেই কোমর ভেঙে যায়, আর তরমুজ আবাদ করলে ঘরে দুই পয়সা নগদ আইসতো। গত ১০ বছর ধরে ধানের পেছনে জমি আর মূলধন ঢালতে ঢালতে আমরা এখন প্রায় নিঃস্ব। আমরা আবার তরমুজ চাষেই ফিরতে চাই।”
কৃষকদের এই সংকটের পেছনে কয়েকটি মুখ্য কারণ উঠে এসেছে:
বোরো চাষে বিপুল লোকসান: প্রতি বিঘা জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ, সেচ, সার, কীটনাশক ও ধান কাটার শ্রমিক খরচ মিলিয়ে যে ব্যয় হয়, বাজারে ধানের বিক্রয়মূল্য তার চেয়ে অনেক কম।
সীমান্তের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা: পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার ঝুঁকিতে প্রায়ই কাঁচা বা আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।
তরমুজের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: বোরো ধানের তুলনায় তরমুজের জীবনকাল কম। সঠিক সময়ে তরমুজ বাজারজাত করতে পারলে প্রতি বিঘায় ধানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মুনাফা অর্জন সম্ভব।
স্থানীয় কৃষি পর্যবেক্ষকদের মতে, হালুয়াঘাটের পাহাড়ি সীমান্তবর্তী বেলে-দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এবং সঠিক আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে কৃষকেরা ধীরে ধীরে তরমুজ চাষ থেকে সরে গিয়ে বোরো নির্ভর হয়ে পড়েছিলেন, যা এখন তাঁদের জন্য অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হালুয়াঘাটের প্রান্তিক চাষীদের আকুল দাবি—উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যেন সীমান্ত এলাকায় পুনরায় তরমুজ চাষের বিস্তার ঘটাতে এগিয়ে আসে। কৃষকদের জন্য মানসম্মত বীজ সরবরাহ, আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হলে হালুয়াঘাটের সীমান্ত এলাকা আবারও তরমুজের বিশাল বাজারে পরিণত হতে পারে।
কৃষকদের বিশ্বাস, সঠিক সরকারি নির্দেশনা ও সহায়তা পেলে বোরো ধানের এই লোকসানি বৃত্ত ভেঙে তরমুজ চাষের মাধ্যমে আবারও তাঁদের ঘরে ফিরবে সমৃদ্ধি ও হাসিমুখ।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: ghoshonanews2024@gmail.com
দৈনিক ষোষণা