প্রতিদিন আজানের ধ্বনিতে মানুষকে নামাজের আহ্বান জানান, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক নানা দায়িত্ব পালন করেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। কিন্তু নিজেদের জীবন-সংসার চালাতেই এখন অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন লালমনিরহাটের অনেক গ্রামীণ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন।
জেলার বিভিন্ন মসজিদে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলের অনেক ইমাম মাসে ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং মুয়াজ্জিনরা এর চেয়েও কম সম্মানীতে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও নগদ অর্থের পাশাপাশি চাল বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হলেও বর্তমান বাজারদরে তা দিয়ে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নয়ারহাট নিদাড়িয়া জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ আনসার আলী মাসে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা সম্মানী পেতেন। এর পাশাপাশি সাপ্তাহিক মুষ্টির চালও দেওয়া হতো। মুয়াজ্জিনের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ইমামের দায়িত্বও পালন করতেন।
দুর্গাপুর জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মমিনুল হক ও পেশ ইমাম মোহাম্মদ আলামিন ইসলাম বলেন, সীমিত সম্মানীতে পরিবার নিয়ে সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীলরা জানান, গ্রামীণ মসজিদের আয় মূলত মুসল্লিদের চাঁদা ও স্থানীয় মানুষের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। আয় কম হলে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী বাড়ানো তো দূরের কথা, অনেক সময় নিয়মিত পরিশোধ করাও সম্ভব হয় না।
এ অবস্থায় ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের আর্থিক সংকট কিছুটা কমাতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে নির্বাচিত মসজিদের কর্মীদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কর্মসূচির আওতায় দেশের ৮২ হাজার ৬৫৬টি নির্বাচিত মসজিদের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৮ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ কর্মসূচির আওতায় ইমাম মাসে ৫ হাজার, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার এবং খাদেম ২ হাজার টাকা করে সম্মানী পাবেন। বছরে দুই ঈদে ১ হাজার টাকা করে মোট ২ হাজার টাকা উৎসব ভাতাও দেওয়ার কথা রয়েছে। এ জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে দেশের সব মসজিদ এই সুবিধার আওতায় আসছে না। নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নির্বাচিত মসজিদগুলোই প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রীয় সম্মানী পাবে।
সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন লালমনিরহাটের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। তাদের আশা, অতিরিক্ত এই অর্থ কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্থায়ী বেতন কাঠামোর দাবি তাদের।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা মডেল মসজিদে পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম নূরী। মসজিদটির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পেশ ইমামের মাসিক সম্মানী ১৫ হাজার, মুয়াজ্জিনের ১০ হাজার এবং প্রত্যেক খাদেমের ৭ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মডেল মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম নূরী বলেন, ইমামদের দায়িত্ব শুধু নামাজ পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় শিক্ষা, জানাজা ও সামাজিক পরামর্শসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্মানী ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মসজিদটির মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সে তুলনায় আয় বাড়েনি। রাষ্ট্রীয় সম্মানীর উদ্যোগ স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এদিকে ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’-এ মসজিদের বিভিন্ন পর্যায়ের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, সিনিয়র পেশ ইমামের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫-এর পঞ্চম গ্রেড, পেশ ইমামের জন্য ষষ্ঠ গ্রেড এবং ইমামের জন্য নবম গ্রেড নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রধান মুয়াজ্জিন দশম এবং মুয়াজ্জিন ১১তম গ্রেডে থাকবেন। একইভাবে প্রধান খাদেম ১৫তম এবং খাদেম ১৬তম গ্রেডে বেতন পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও পাঞ্জেগানা মসজিদের ক্ষেত্রে মসজিদের সামর্থ্য অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মীদের আবাসন, ভবিষ্যৎ কল্যাণে সঞ্চয় এবং চাকরি শেষে এককালীন সম্মাননার ব্যবস্থার কথাও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন লালমনিরহাটের উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ মসজিদের জনবলের সম্মানী ও ব্যবস্থাপনা সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৪ সালে জাতীয় সংসদে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মসজিদে প্রায় ১৭ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিন কর্মরত রয়েছেন।
লালমনিরহাটের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয় সম্মানীর এই উদ্যোগ যেন শুধু সাময়িক সহায়তায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের জন্য স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মানী কাঠামো নিশ্চিত করা হোক।