ঝিনাইদহে কথিত মানবাধিকার চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুল হাসানকে আটক এবং তার কাছ থেকে ওয়াকিটকি, ভুয়া আইডি কার্ড, মানবাধিকার লেখা পোশাক, একাধিক সিম ও প্রাইভেটকার উদ্ধারের ঘটনা কেবল একটি প্রতারণা মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক আস্থা এবং মানবাধিকার আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি আঘাত।
দীর্ঘদিন ধরে “মানবাধিকার”, “আইন সহায়তা”, “দুর্নীতি দমন”, “তদন্ত টিম”, “সাংবাদিকতা” এবং “বিশেষ বাহিনী”র মতো স্পর্শকাতর শব্দ ব্যবহার করে একটি চক্র সাধারণ মানুষের আবেগ, ভয় ও আইনি অজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে এমন অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ অনুযায়ী এই চক্র শুধু অর্থ আত্মসাৎই করেনি; বরং প্রশাসনের আদলে ওয়াকিটকি, ইউনিফর্ম, আইডি কার্ড এবং কথিত তদন্ত সেল গঠন করে নিজেদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প বলয় হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনো সাধারণ জালিয়াতি নয়। এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার শামিল। কারণ যখন সাধারণ মানুষ ভুয়া পরিচয়ধারীদের হাতে প্রতারিত হয়, তখন প্রকৃত মানবাধিকার সংগঠন, বৈধ গণমাধ্যম ও আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো নাগরিক কাঠামো।
অভিযোগে উঠে এসেছে, “কার্ড বাণিজ্য”, চাকরির প্রলোভন, তদন্ত টিমে নিয়োগ, ওয়াকিটকি সরবরাহ, জমি বিরোধ নিষ্পত্তি, এমনকি প্রশাসনিক সংযোগের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়। যদি তদন্তে এসব সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি একটি সুসংগঠিত প্রতারণা চক্র হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। শুধু দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪১৯ ও ৪২০ ধারায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রয়োজন হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানিলন্ডারিং, প্রতারণামূলক সংগঠন পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় অপব্যবহারের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশে “মানবাধিকার”, “দুর্নীতি দমন”, “ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন”, “আইন সহায়তা”, “নিউজ পোর্টাল” ইত্যাদি নাম ব্যবহার করে কত অসংখ্য ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে উঠেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা কি সরকারের কাছে আছে? যদি না থাকে, তাহলে এখনই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় ও জয়েন্ট স্টক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার।
কারণ, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আদলে ইউনিফর্ম, ওয়াকিটকি ও তদন্ত সেল গঠন করে, তবে তা ভবিষ্যতে ভয়ংকর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা রাজনৈতিক অপব্যবহারের পথও খুলে দিতে পারে।
মানবাধিকার একটি মহৎ ও সংবেদনশীল বিষয়। এটি কখনোই প্রতারণার ঢাল হতে পারে না। প্রকৃত মানবাধিকারকর্মীরা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের জন্য নয়। তাই এই ঘটনায় নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন জরুরি।
রাষ্ট্রের কাছে এখন জনগণের প্রত্যাশা একটাই শুধু একজনকে গ্রেপ্তার করলেই দায় শেষ নয়; বরং সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা এ ধরনের ভুয়া সংস্থা, অবৈধ টিম, প্রতারণামূলক কার্ড বাণিজ্য ও অনুমোদনহীন মানবাধিকার ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে দোষীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ মানবাধিকার কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মুখোশ পরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: [email protected]
দৈনিক ষোষণা