কোনো সমাজের সভ্যতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রকৃত পরিমাপ নির্ভর করে সেই সমাজ তার শিশুদের জন্য কতটা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে, তার ওপর। শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা নিরাপদ আশ্রয়, আস্থা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্র। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠানোর সময় অভিভাবকরা শুধু লেখাপড়ার দায়িত্বই নয়, সন্তানের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নটুকুও সেই প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেন। কিন্তু যখন সেই প্রতিষ্ঠানেই যৌন নির্যাতন কিংবা বলাৎকারের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন তা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিশু যৌন নির্যাতনের একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কখনো শিক্ষক, কখনো আবাসিক সুপার, আবার কখনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার পর জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি উঠেছে। কিন্তু কয়েক দিন পরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বিষয়টি হারিয়ে গেছে। অথচ সমস্যার মূল কারণগুলো রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই।
বাস্তবতা হলো, প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোই পুরো চিত্র নয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই (অমুবাচা) এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার বহু ঘটনাই অভিযোগ পর্যন্ত পৌঁছায় না। সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় আবেগ, স্থানীয় প্রভাব, বিচারহীনতার আশঙ্কা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর চাপের কারণে অনেক ঘটনাই নীরবে চাপা পড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) শিশু যৌন নির্যাতনকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। ইউনিসেফের বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধী এমন কেউ, যাকে শিশুরা চেনে, বিশ্বাস করে এবং যার ওপর নির্ভরশীল থাকে। অর্থাৎ অপরাধের ক্ষেত্র হিসেবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আবাসিক পরিবেশগুলোই অনেক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা বা মাদ্রাসার একক সমস্যা নয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এতিমখানা, ক্রীড়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র কিংবা অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তাই কয়েকজন অপরাধীর কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টাও সমানভাবে বিপজ্জনক।
বাংলাদেশে আলিয়া ও কওমি ধারার হাজার হাজার মাদ্রাসায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ আবাসিক। ফলে অনেক শিশুকে দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে অবস্থান করতে হয়। শিক্ষক, হোস্টেল তত্ত্বাবধায়ক কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। আর ক্ষমতা ও আস্থার এই সম্পর্ককে ব্যবহার করেই অনেক ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা শুধু তাৎক্ষণিক শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় না; বরং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মহত্যাপ্রবণতার মতো জটিল সমস্যার মধ্যে পড়তে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এই মানসিক ক্ষত প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত বহমান থাকে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো যৌন নির্যাতনের শিকার শিশু ও তার পরিবারকে অনেক সময় সামাজিকভাবে বিব্রত হতে হয়। অনেক অভিভাবক মনে করেন, অভিযোগ করলে সন্তানকে আজীবন সামাজিক অপমানের বোঝা বহন করতে হবে। ফলে তারা নীরবতা বেছে নেন। এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সুনামের কথা বলে স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। কোথাও ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলা হয়, কোথাও প্রভাবশালী মহল ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ অপরাধ গোপন করা মানে ভবিষ্যতের আরও শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইন-২০১৩ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামো বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষী সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল অপরাধীর শাস্তি কি যথেষ্ট?
নিঃসন্দেহে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু বিচারের পাশাপাশি যদি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করা না যায়, তাহলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ফিরে আসবে।
প্রথমত, দেশের সব ধরনের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা স্কুল- সব ক্ষেত্রেই শিশু সুরক্ষার অভিন্ন মানদণ্ড থাকতে হবে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি এবং অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। কেবল ধর্মীয় জ্ঞান বা একাডেমিক যোগ্যতা নয়, ব্যক্তির নৈতিক আচরণ, মানসিক সুস্থতা এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলের মূল্যায়নও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
তৃতীয়ত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোনো শিশু কিংবা অভিভাবক যাতে ভয়, লজ্জা বা চাপের কারণে নীরব থাকতে বাধ্য না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মাদ্রাসা বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান যাচাইকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পঞ্চমত, শিশুদের বয়স উপযোগী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং বিপদের সময় কোথায় সাহায্য চাইতে হবে- এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা কোনো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নয়; বরং শিশু সুরক্ষার অপরিহার্য অংশ।
ষষ্ঠত, ধর্মীয় নেতা, আলেম-ওলামা এবং মাদ্রাসা পরিচালকদের আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কোনো অপরাধী ধর্মের প্রতিনিধি নয়। তাই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার নামে অপরাধ আড়াল না করে, বরং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই প্রকৃত ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমস্যার গভীরতা তুলে ধরা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশু যৌন নির্যাতনকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করা উচিত নয়। এটি মূলত একটি মানবিক সংকট। কোনো অপরাধীর জন্য পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করা যেমন ভুল, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার নামে অপরাধকে গোপন করাও ক্ষমার অযোগ্য।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশু যখন পরিবার থেকে দূরে কোনো মাদ্রাসায় যায়, তখন তার বাবা-মা সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিই অর্পণ করেন। সেই বিশ্বাস রক্ষা করা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়; রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
প্রতিবার নতুন কোনো ঘটনা সামনে এলে ক্ষোভ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা এবং পরে তা ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা।
একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় তার সুউচ্চ অট্টালিকা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্যে নয়; বরং সেই দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, তার ওপর নির্ভর করে। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীর বিচার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে আর ভয়, নীরবতা কিংবা অসহায়ত্বের মধ্যে বেড়ে উঠতে না হয়।
কারণ একটি নির্যাতিত শিশু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাই শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। এখনই সময়, বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার। কেননা শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: [email protected]
দৈনিক ষোষণা