ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নেওয়ার পরও রক্ষা পায়নি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। মূল অভিযুক্তকে পুলিশ দ্রুত গ্রেপ্তার করলেও তার জের ধরে বাদাঘাট বাজার ও গড়কাটি গ্রামে অন্তত তিনটি মন্দির, একাধিক বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিচারের দাবির আড়ালে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত হয়েছে প্রতিশোধমূলক ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করলেও স্থানীয়দের মধ্যে এখনো উদ্বেগ কাটেনি।
যা ঘটেছিল স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেলে দীপ্ত রায় ওরফে প্রিন্স রায় (১৮) নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী একটি আপত্তিকর পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ওই রাতেই গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী দীপ্ত রায়কে গ্রেপ্তার করে। পরদিন পুলিশ বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে যখন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন কেন নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ের ওপর হামলা চালানো হলো?
অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা, লুটপাটের অভিযোগ বুধবার সকালে গড়কাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় অভিযুক্ত দীপ্ত রায়ের বাড়িতে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন। দীপ্তর মা কেতকি রানী রায় অভিযোগ করেন, ফেসবুক পোস্টের ঘটনায় ছেলেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পরই শত শত লোক তাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়। তার ভাষ্য, আমাদের ঘরের আসবাবপত্র, পানির ট্যাংকি, মোটরসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে, অনেক কিছু লুট করে নিয়ে গেছে। আমার স্বামী ও ছেলেরা এখন জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
মন্দিরে ভয়াবহ তাণ্ডব
তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদার জানান, হামলায় গড়কাটি কালী মন্দির, একটি দুর্গা মন্দির এবং সংশ্লিষ্ট নাটমন্দিরসহ মোট তিনটি ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে হামলার আশঙ্কার খবর পেয়ে আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অবহিত করি। কিন্তু পরদিন সকালে গিয়ে দেখি মন্দিরের তালা ভেঙে ফেলা হয়েছে। কালী প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। ভোগমন্দিরের কাঁসার বাসনপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নেই। অফিস কক্ষের চেয়ার-টেবিলও ভাঙচুর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীরা শুধু প্রতিমা ভাঙচুরেই থেমে থাকেনি; উপাসনালয়ের বিভিন্ন সামগ্রীও লুট করে নিয়ে গেছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা বাদাঘাট বাজারের ব্যবসায়ী অরুণ রায় জানান, সন্ধ্যার দিকে একদল লোক তার দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে।
তিনি বলেন, যে অপরাধ করেছে তার বিচার হোক। আমরাও বিচার চাই। কিন্তু একজনের অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে নিরীহ মানুষের দোকান ও বাড়িঘরে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
‘ফেসবুক আইডি ব্যবহারের’ অভিযোগ স্থানীয় স্কুল শিক্ষক রিপন রায় দাবি করেন, দীপ্ত রায়ের মোবাইলে একটি আপত্তিকর স্ক্রিনশট সংরক্ষিত ছিল। তার ধারণা, ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তি শত্রুতাবশত সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে। তবে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
প্রশাসনের কঠোর বার্তা ঘটনার পর বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি মন্দির কর্তৃপক্ষ, আলেম-ওলামা, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে অভিযুক্তকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিচার চলবে। কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন্দির, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর কিংবা লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে এবং পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, তাদের শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্প্রীতির জন্য নতুন হুমকি স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগের বিচার রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও সম্পত্তিতে হামলা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
তাদের প্রশ্ন যদি মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়েই থাকে, তাহলে কারা এবং কোন উদ্দেশ্যে এই হামলা চালালো? কারা জনতাকে উসকে দিল? ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দাবি, শুধু অভিযুক্ত গ্রেপ্তার নয় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদেরও দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা পাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: [email protected]
দৈনিক ষোষণা