সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নে মরা চেলা নদী থেকে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের মহোৎসব। একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় প্রতিদিন কোটি টাকার সরকারি সম্পদ লুট করা হলেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ইউনিয়নের সোনাইত্যা, চরুগাঁও, দ্বীনেরটুক ও শ্রীপুর বীরেন্দনগর এলাকায় নদী থেকে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, চাইরগাঁও গ্রামের খেলার মাঠ সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে পাচার করা হচ্ছে। দিনের বেলা বালু স্তূপ করে রাখা হয় এবং রাত ৭ টার পর শুরু হয় পরিবহনের তাণ্ডব। নরসিংপুর বাজার হয়ে শত শত ট্রাক বালু ও পাথর নিয়ে ছাতকসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রওনা দেয়, যা চলে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত।
স্থানীয়রা জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত সুসংগঠিত। বালিউরা বাজারে তাদের নিজস্ব পাহারাদার বা ‘লাইনম্যান’ নিযুক্ত থাকে। পুলিশ বা প্রশাসনের কোনো গাড়ি ওই এলাকায় প্রবেশ করলেই পাহারাদাররা তাৎক্ষণিক মোবাইল ফোনে বালু খেকোদের সতর্ক করে দেয়। ফলে অভিযান শুরুর আগেই ট্রাক ও সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলা হয়। পুলিশের নিয়মিত নজরদারি না থাকায় চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং তীব্র ভাঙনের মুখে গ্রামবাসী তাদের ভিটেমাটি হারাচ্ছে। অন্যদিকে, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ওজনের বালু ও পাথরবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে এলাকার রাস্তাঘাটগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাতের বেলায় ট্রাকের গগনবিদারি শব্দে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে; অনেক শিশু আতঙ্কে রাতে চিৎকার করে কেঁদে উঠছে।
স্থানীয়দের দাবি:- অসহায় গ্রামবাসী ও ভুক্তভোগীরা জানান, এই অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন অবিলম্বে বন্ধ না হলে নরসিংপুর ইউনিয়ন এক সময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে। তারা এই ‘বালু খেকো’ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে এবং জনপদ রক্ষায় জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। পুলিশের অভিযান এড়াতে বালিউরা বাজারে সার্বক্ষণিক পাহারাদার মোতায়েন করে রেখেছে ওই চক্রটি। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কোনো গাড়ি এলাকা অভিমুখী রওনা দিলেই সেই খবর চক্রের কাছে পৌঁছে দেয় দায়িত্বরত পাহারাদাররা। মুহূর্তের মধ্যে ট্রাকগুলো সরিয়ে ফেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানো হয়। এই ‘লুকোচুরি’ খেলার পেছনে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কারো যোগসাজশ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গ্রামবাসী।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে কৃষি জমি ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভারী ট্রাকের চলাচলে এলাকার রাস্তাঘাট ধসে গিয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ট্রাকের বিকট শব্দে বৃদ্ধ ও শিশুরা চরম আতঙ্কে ভোগে। অনেক শিশু ভয়ে রাতে কেঁদে ওঠে, কিন্তু প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর কতিপয় সদস্যকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে বেপরোয়াভাবে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের ফলে আমাদের পরিবেশ ও জনপদ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অরূপ রতন সিংহ জানান:- প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত রয়েছে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।কেবল অভিযান বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে কোনো সামাজিক ব্যাধি বা অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। কারণ, প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে অসাধু চক্র আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়,যদি সাধারণ মানুষ ক্ষতিকর কাজের কুফল বুঝতে পারে এবং সামাজিকভাবে তা বর্জন করে, তবেই এসব অপরাধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব।