গত কয়েকদিনের টানা অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছায়। বর্তমানে পানি কমতে শুরু করলেও এর সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, জেলার আটটি উপজেলার অন্তত ৩৩টি পয়েন্টে নদীভাঙন স্পষ্টভাবে শনাক্ত হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট, উলিপুর, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ভাঙন সবচেয়ে বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি এবং রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়ন বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০টি ২৫০ কেজি ওজনের জিও ব্যাগের চাহিদা নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সুখেরবাতি এলাকার জন্য ৩৪ হাজার ৬০০টি এবং কোদালকাটি এলাকার জন্য ৩০ হাজার জিও ব্যাগের প্রয়োজন রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় স্থানে জিও ব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে যেসব এলাকায় জিও ব্যাগ পৌঁছেছে, সেখানে ডাম্পিং কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। এতে কয়েকটি স্থানে নদীভাঙনের গতি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে বলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর যাত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কারণে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। কখন যে ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই আতঙ্কে আছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন এবং দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন সেই আশাতেই দিন পার করছি।
রৌমারী উপজেলার বাসিন্দা সালাম বলেন, নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে আছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করেছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এবার আমাদের বসতভিটা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীতীর পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। নদীভাঙন পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, বর্তমানে ৩০টি নদীভাঙন পয়েন্ট সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এছাড়া আরও ১০টি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেখানে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেখানে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি স্থানে প্রায় ৭৫ মিটার করে সংরক্ষণ কাজ করা হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায়ও প্রতিরক্ষা কাজের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ব্রহ্মপুত্র নদীর বাম তীরে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে কুড়িগ্রাম জেলায় নদীভাঙন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলাধীন ধরলা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ বাম ও ডান তীর সংরক্ষণ শীর্ষক একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের আওতায় ধরলা নদীর উভয় তীরে দীর্ঘ তীর সংরক্ষণ কাজ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন, বসতভিটা ও কৃষিজমি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জেলা জুড়ে নদীভাঙনের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ধারাবাহিক তৎপরতা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি প্রতিরক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদী স্থানীয় বাসিন্দারাও।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: ghoshonanews2024@gmail.com
দৈনিক ষোষণা