আগামীকাল স্মরণ করা হবে এ ভূখণ্ডের এক কিংবদন্তিকে—একজন ন্যায়নিষ্ঠ, আপসহীন এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিচারপতিকে। যাঁর নাম স্বাধীনতার পূর্ব ইতিহাসে যেমন উজ্জ্বল, স্বাধীনতার পরেও দেশের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের অগ্রযাত্রায় চিরস্মরণীয়—তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ। তাঁর ১১৫তম জন্মবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে।
আইনের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি আইনবিদ। তিনি শুধু আদালতের বিচারকই নন—তিনি ছিলেন আইনের শাসনের প্রবক্তা, মানবাধিকার রক্ষার প্রতীক এবং সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের নির্ভীক কণ্ঠ।
১৯৬৪ সালে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি নিন্ম আদালতের উন্নয়ন, বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশাল ভূমিকা রাখেন। তাঁর রায়, পর্যবেক্ষণ এবং বিচারিক দর্শন শুধু পাকিস্তানেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়।
সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ইতিহাসে এটি ছিল ন্যায়বিচারের পক্ষে এক ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব প্রতিবাদ—যা আজও আইনের ছাত্রদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
উচ্চশিক্ষা, মেধা ও ব্যারিস্টারি ডিগ্রি ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ। তাঁর বাবা সৈয়দ আবদুস সালেক ছিলেন বঙ্গীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা। জাতীয় নেতৃবৃন্দের পরিবারে তাঁর শৈশব ও কৈশোর গড়ে ওঠে নিয়মতান্ত্রিক ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ছিলেন তাঁর মামা।
১৯২৬: বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকে রাজশাহী বিভাগে প্রথম ১৯৩০: প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ,১৯৩২: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ,১৯৩৩: প্রথম শ্রেণিতে আইন পরীক্ষা উত্তীর্ণ ,১৯৩৯: যুক্তরাজ্যের দ্য অনারেবল সোসাইটি অব লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি , এই অসাধারণ শিক্ষাগত অর্জন তাঁর ভবিষ্যৎ কর্ম জীবনে প্রজ্ঞা ও দক্ষতার অমূল্য ভিত্তি তৈরি করে।
কর্মজীবনের বিস্তার ও সাফল্য ,১৯৫৪: ঢাকা হাইকোর্টে যোগদান ,১৯৫৪: হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত, ১৯৬২–১৯৬৩: পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, ১৯৬৪: পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন এমন এক বিচারক যিনি আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গভীর দর্শন ও মানবতার দৃষ্টিকোণকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁর দেয়া বেশ কিছু রায় আজও আইনশাস্ত্রে ‘ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট’ হিসেবে গণ্য হয়।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা তিনি আইন ছাড়াও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চিন্তাধারায় ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। বাংলা-ইংরেজি ছাড়াও বহু ভাষায় তাঁর দখল ছিল। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল ইসলামী চিন্তাবিদ ও গণতন্ত্রের অকুতোভয় সমর্থক।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, যা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশাল সাহসিকতার পরিচয়।
জাতির ক্রান্তিকালে দৃপ্ত ভূমিকা পাকিস্তানের দমন-পীড়নমূলক শাসন, আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সময় তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে নিরলস ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রভাব আইনজীবী, রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবী সমাজকে নতুন দিশা দেখায়।
শেষ জীবন ও প্রয়াণ , বিচারপতি মোর্শেদ ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ন্যায়বিচারের দর্শন আজও জীবন্ত। ১১৫তম জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচি এ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাঁর স্মরণে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বনানী কবরস্থান, সময়: সকাল ১০:৩০ , আয়োজক: সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ স্মৃতি সংসদ, অনুষ্ঠান:
পুষ্প অর্পণ , ফাতেহা পাঠ, কুরআনখানি, স্মরণসভা, তারিখ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, সময়: বিকেল ৫টা
স্থান: শিশু কল্যাণ পরিষদ , আলোচক: সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ (শেরে বাংলা একে ফজলুল হক গবেষণা পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা)
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা (জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান) ,বিবৃতিতে তাঁরা দেশবাসীকে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে বনানী কবরস্থানে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আজকের বাংলাদেশে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক, বিচারিক ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মোরশেদের মতো সাহসী, দেশপ্রেমিক, নৈতিক ও ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। তাঁর জীবন, কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশিকা হতে পারে।
ন্যায়বিচারের প্রতি আপসহীন অবস্থান মানবাধিকারের পক্ষে সুস্পষ্ট ভূমিকা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকার
সামরিক ও একনায়কতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিদ্বেষমুক্ত, প্রগতিশীল চিন্তা সব মিলিয়ে তিনি আজও সময়ের জন্য দৃষ্টান্ত।
বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ছিলেন এক অনন্য চরিত্র—যাঁর ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, নীতি-আদর্শ এবং রাষ্ট্র-সমাজে অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে অমলিন। তাঁর ১১৫তম জন্মবার্ষিকীতে জাতি তাঁকে কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছে। এমন মানুষ যতবার জন্মগ্রহণ করেন, ইতিহাস ততবার সমৃদ্ধ হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: ghoshonanews2024@gmail.com
দৈনিক ষোষণা