গাজীপুরের কাশিমপুরের বিভিন্ন সড়ক ও শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে কথিত চোরাই জ্বালানি তেলের বেচাকেনা। বিভিন্ন কারখানা ও কোম্পানির ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ ভারী যানবাহন থেকে তেল নামিয়ে এসব স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে কাশিমপুরের বিভিন্ন এলাকায় এমন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি স্থান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কিছু যানবাহনের চালক গাড়ির ট্যাংক থেকে ডিজেলসহ জ্বালানি তেল বের করে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। পরে ওই তেল তুলনামূলক কম দামে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি চুরির কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং তেল চুরি, সংগ্রহ ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি লাভজনক বাণিজ্য।
চোরাই তেলের এই বেচাকেনা সব জায়গায় প্রকাশ্যে হচ্ছে না। অনুসন্ধানে এমন কিছু স্থানের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে সড়কের পাশে দোকান না রেখে নির্জন জায়গায় বড় গাড়ি প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাড়ি ভেতরে প্রবেশের পর গেট বন্ধ করে পাইপের মাধ্যমে ট্যাংক থেকে তেল নামিয়ে ড্রাম, ক্যানসহ বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করা হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কাশিমপুর থানার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভবানীপুর এলাকায় ভবানীপুর-আন্দারমানিক সড়কে মহিউদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীর একটি স্থানেও এমন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে চক্রবর্তী ও কবিরপুর এলাকায় রাস্তার পূর্ব পাশের একটি স্থানে একইভাবে চোরাই তেলের ব্যবসা করার অভিযোগ কবির নামের এক। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নির্জন স্থানে বড় গাড়ি ঢোকানো হয় এবং গাড়ি প্রবেশের পর গেট বন্ধ করে তেল নামানোর ব্যবস্থা করা হয়।
প্রকাশ্য সড়কের পরিবর্তে নির্জন স্থানে গাড়ি ঢুকিয়ে জ্বালানি তেল নামানোর এমন ব্যবস্থা থাকায় এসব স্থানে নিয়মিত তেল বেচাকেনার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
চোরাই তেলের বেচাকেনার পাশাপাশি এসব স্থানে জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রির বৈধতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্রের কোনো কোনোটিতে বিস্ফোরক লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স এবং জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রির প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।
ফায়ার সার্ভিসের ই-লাইসেন্স ব্যবস্থায় ‘জ্বালানী তেল (Fuel Oil)’ ব্যবসার ধরন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের দাহ্য বস্তু মজুত, ক্রয় বা বিক্রি করা হবে, লাইসেন্স আবেদনে তা উল্লেখ করার বিধান রয়েছে।অন্যদিকে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, পেট্রোলিয়াম মজুতের পরিমাণ ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়। মোটরযানে জ্বালানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে পাম্পযুক্ত ট্যাংকে পেট্রোলিয়াম মজুতের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত লাইসেন্সের বিধান রয়েছে।
তবে কাশিমপুরের এসব কথিত চোরাই তেলের স্থানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বৈধভাবে তেল সংগ্রহের কাগজপত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানা বা কোম্পানির গাড়ি থেকে চুরি করা তেল বাজারদরের তুলনায় কম দামে পাওয়া যায়। ফলে কিছু চালক গাড়ির জ্বালানি বিক্রি করে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পান। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা কম দামে তেল সংগ্রহ করে আবার বিক্রি করে লাভ করেন।
একটি গাড়ি থেকে অল্প অল্প করে নিয়মিত তেল সরিয়ে নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়ের হিসাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বড় হতে পারে। পাশাপাশি চোরাই তেলের নিশ্চিত ক্রেতা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি চুরিও একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চোরাই তেলের ব্যবসা পরিচালনায় স্থানীয় থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা থানা ও হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে কিংবা পুলিশকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
তাদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তেল বেচাকেনার অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমানভাবে নিয়মিত অভিযান বা কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে বড় গাড়ি প্রবেশ এবং তেল নামানোর অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কাশিমপুরে কথিত চোরাই তেলের এই ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন কারখানা ও কোম্পানির যানবাহনের জ্বালানি চুরির যোগসূত্র থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোন গাড়ি থেকে তেল আসছে, কারা তেল সরবরাহ করছে এবং কোথায় তা মজুত ও বিক্রি হচ্ছে—এসবের একটি চক্রের মাধ্যমে ব্যবসাটি পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তেল বিক্রির স্থানগুলোতে বিস্ফোরক লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স, জ্বালানি তেল মজুত ও বিক্রির অনুমোদন এবং তেলের ক্রয়-বিক্রির কাগজপত্র না থাকলে এসব কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, কাশিমপুরের বিভিন্ন সড়ক ও নির্জন এলাকায় পরিচালিত এসব তেলের দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে তেলের উৎস ও বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কারখানার গাড়ি থেকে জ্বালানি চুরি এবং তা বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে।
কাশিমপুরের শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ভারী যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহনের জ্বালানি চুরি, অবৈধভাবে মজুত ও বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অনুমোদনহীনভাবে দাহ্য জ্বালানি মজুত করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা রয়েছে।
তাই কাশিমপুরের বিভিন্ন এলাকায় কথিত চোরাই তেলের বেচাকেনা, জ্বালানি তেলের উৎস, মজুত ও বিক্রির বৈধতা এবং সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: ghoshonanews2024@gmail.com
দৈনিক ষোষণা