তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ই-মেইলে তথ্য চাওয়ার পর ৩৪ হাজার ২০০ টাকা তথ্যমূল্য নির্ধারণ করায় আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়কে ঘিরে তীব্র প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য অধিকার আইন যেখানে নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে, সেখানে একটি সাধারণ তথ্য আবেদনের বিপরীতে এত বড় অঙ্কের অর্থ দাবি তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে নিরুৎসাহিত করার অপচেষ্টা কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত ১ জুন ২০২৬ তারিখে ডাকযোগে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছে নির্ধারিত ফরমে বিভিন্ন তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়। আবেদনটি ২ জুন ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গৃহীত হয়।
আবেদনপত্রে তথ্য প্রাপ্তির মাধ্যম হিসেবে স্পষ্টভাবে ই-মেইল উল্লেখ করা হয়। কিন্তু আবেদনকারীর বিস্ময়ের সীমা থাকে না, যখন ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মনজুরুল হক কাওসার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তথ্য সরবরাহের মূল্য বাবদ ৩৪ হাজার ২০০ টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এখানেই উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তথ্য অধিকার (তথ্য প্রাপ্তি সংক্রান্ত) বিধিমালার বিধি-৮ এর ফরম ‘ঘ’-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, লিখিত বা কম্পিউটার প্রিন্টকৃত এ-৪ আকারের প্রতি পৃষ্ঠার তথ্যের মূল্য মাত্র ২ টাকা। একই বিধিমালায় বলা হয়েছে, আবেদনকারী নিজে ডিস্ক বা সিডি সরবরাহ করলে সেই মাধ্যমে তথ্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে।
কিন্তু যখন আবেদনকারী শুরু থেকেই ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য চেয়েছেন, তখন কোন আইনি বিধান, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অথবা কোন হিসাবের ভিত্তিতে ৩৪ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, তথ্য অধিকার আইন নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হলেও বাস্তবে কিছু সরকারি দপ্তরে তথ্য চাওয়াকে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এমন অস্বাভাবিক অঙ্কের তথ্যমূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা সাধারণ নাগরিক, গবেষক, সাংবাদিক বা তথ্যপ্রত্যাশীদের জন্য কার্যত একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মনজুরুল হক কাওসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “হিসাব অনুযায়ী তথ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।”তবে সেই হিসাব কী, কত পৃষ্ঠার তথ্যের জন্য এই অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে, ই-মেইলে তথ্য প্রদান করলে এত ব্যয় কীভাবে সৃষ্টি হয়, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ দিক হলো, তথ্যমূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত চিঠিটি বরগুনা সদর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্যাডে ইস্যু করা হলেও তাতে স্বাক্ষর করেছেন আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।সরকারি নথিপত্রে অন্য কার্যালয়ের প্যাড ব্যবহার নিছক অসাবধানতা, দাপ্তরিক গাফিলতি নাকি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল, সে প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। সরকারি দপ্তরের আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে এমন অসঙ্গতি সাধারণত কাম্য নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালকের বক্তব্য জানার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবস্থানও জানা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু তথ্য চাওয়ার বিপরীতে অস্বাভাবিক অর্থ দাবি করা হলে তা আইনের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।এখন জনমনে প্রশ্ন, ই-মেইলে তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ৩৪ হাজার ২০০ টাকার এই বিল কি সত্যিই আইনসম্মত? নাকি এটি তথ্যপ্রাপ্তির পথকে জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলার একটি উদাহরণ?
সচেতন নাগরিকরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং তথ্য অধিকার আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে কোনোভাবেই অযৌক্তিক ব্যয় বা প্রশাসনিক জটিলতার আড়ালে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: [email protected]
দৈনিক ষোষণা