সরকারি উন্নয়ন কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চালু হয়েছিল ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য ছিল টেন্ডার সিন্ডিকেট, প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ এবং দরপত্র বাণিজ্যের অবসান। কিন্তু সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা এলজিইডির একটি এলটিএম (LTM) টেন্ডারকে ঘিরে এমন সব প্রশ্ন উঠেছে, যা এখন ঠিকাদার সমাজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মহলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রকৌশলী রজত কান্তি দাস এবং সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, পছন্দের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে এবং এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু ব্যবসায়ী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার লিটল বার্ড স্কুলের ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজের জন্য টেন্ডার আইডি-১২৮৬৪৪১ এর আওতায় প্রায় ১৩ লাখ টাকার একটি এলটিএম টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এই টেন্ডারে জেলার ৯৬ জন ঠিকাদার শিডিউল ক্রয় করেন এবং ৯৩ জন ঠিকাদার অনলাইনে দরপত্র জমা দেন। কিন্তু মূল্যায়নের শেষ ধাপে এসে দেখা যায়, প্রতিযোগিতার তালিকায় রয়েছে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান।
সেগুলো হলো—মেসার্স আহনাফ এন্টারপ্রাইজ,মেসার্স আশিক এন্টারপ্রাইজ,মেসার্স করিম আলী এন্ড সন্স,মেসার্স ফিরোজ এন্টারপ্রাইজ,মেসার্স শিফা এন্টারপ্রাইজ। পরবর্তীতে ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে কার্যাদেশের জন্য নির্বাচিত হয় মেসার্স করিম আলী এন্ড সন্স। এখানেই শুরু হয় বিতর্ক।যেখানে ৯৩ জন ঠিকাদার দরপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে কোন প্রক্রিয়ায় ৮৮ জন বাদ পড়লেন? তাদের দরপত্র কি অযোগ্য ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে তারা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেলেন?প্রশ্ন উঠেছে, এই বাছাই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কী ছিল?
ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সাবেক কাউন্সিলর কামাল হোসেন বলেন,"আমরা নিয়ম মেনে অংশগ্রহণ করেছি। টাকা খরচ করে শিডিউল কিনেছি। অথচ শেষ পর্যন্ত ৫ জনকে রেখে ৮৮ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা জানতে চাই, কোন নিয়মে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?"
আরেক অংশগ্রহণকারী ঠিকাদার হুমায়ুন করিব বলেন,"ই-জিপি ব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থা ছিল। কিন্তু এই ঘটনার পর অনেকেই হতাশ। যদি এত সহজে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী বাদ পড়ে যায়, তাহলে স্বচ্ছতার প্রশ্ন থেকেই যায়।"নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বিশ্বম্ভরপুর এলজিইডির টেন্ডার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তাদের দাবি, অনলাইনে রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও এত বড় সংখ্যক অংশগ্রহণকারী বাদ পড়ার বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা অফিসে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলম। অভিযোগকারীদের মতে, দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে থাকার কারণে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে উঠেছে। যদিও এই অভিযোগের স্বপক্ষে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
চলতি বছরের শুরুতে উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন রজত কান্তি দাস। অভিযোগকারীদের দাবি, সাম্প্রতিক টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে তাঁর নামও জড়িয়ে রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রকৌশলী রজত কান্তি দাসের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন,"বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।"
বিশ্বম্ভরপুরের এই টেন্ডার এখন শুধু একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের বিষয় নয়; এটি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ই-জিপি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৯৩ জন ঠিকাদারের অংশগ্রহণ থেকে মাত্র ৫ জনে নেমে আসার এই অঙ্কের উত্তর এখন খুঁজছে ঠিকাদার সমাজ।কারণ প্রশ্ন যত বড়, তার উত্তরও ততটাই জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: [email protected]
দৈনিক ষোষণা