বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের অবদান কেবল একটি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার নড়াইল, যশোর, মাগুরা ও ঝিনাইদহ অঞ্চলের মানুষের কাছে তেমনই এক কিংবদন্তির নাম মুন্সী ওয়ালীউর রহমান। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন বিশিষ্ট এম.এল.এ, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সাহসী সংগঠক, জনদরদী রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী সমাজসংস্কারক এবং উন্নয়নমুখী নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক।
নড়াইলের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়,বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ নড়াইল আয়তনে ছোট হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ক্রীড়া ও রাজনৈতিক চেতনায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চিত্রা, নবগঙ্গা, মধুমতি, কাজলা ও আঠারোবাকি নদীবিধৌত এই অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন বহু কৃতী ও ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। এই মাটিই উপহার দিয়েছে কমরেড অমল সেন, সৈয়দ নওশের আলী, নূর জালাল, এডভোকেট আফসার উদ্দিন আহমেদ, এডভোকেট খন্দকার আব্দুল হাফিজ, এখলাস উদ্দিন আহমেদ এবং কমরেড রসিক লাল ঘোষের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে।
তবে ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নড়াইলের যেসব নেতা বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সৈয়দ নওশের আলী ও মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী,নন্দিত, গণ মানুষের নেতা। জনমানুষের অধিকার আদায়ে তাঁদের সংগ্রাম আজও ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
জন্ম, পরিবার ও শিক্ষাজীবন মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ১৮৯১ সালের ১৫ আগস্ট মাসে নড়াইল মহকুমার সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের মীর্জাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মুন্সী মোঃ মোকাম্মেল এবং মাতা মোছাম্মত মেহেরজান।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। গ্রামের এম.ই বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা করে পরবর্তীতে স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে আই.এ সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতায় গমন করেন। সেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে। তরুণ ওয়ালীউর রহমানের মেধা, সততা ও নেতৃত্বগুণে মুগ্ধ হয়ে শেরে বাংলা তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। এই পরিচয়ই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। শিক্ষকতা, আইনশিক্ষা ও পেশাজীবন শেরে বাংলার সহযোগিতায় মুন্সী ওয়ালীউর রহমান দক্ষিণ খুলনায় প্রাইমারি স্কুল পরিদর্শক পদে চাকরির সুযোগ লাভ করেন। পরে তিনি বারাসাত গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা জীবনের মধ্য দিয়েই তিনি সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পরামর্শে তিনি আইন বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন এবং কলকাতা থেকে এল.এল.বি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে নড়াইল শহরে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ধারণা করা হয়, তিনি নড়াইল অঞ্চলের প্রথম দিককার মুসলিম আইনজীবীদের অন্যতম ছিলেন।
আইন পেশার পাশাপাশি তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হন।
কৃষক-প্রজা আন্দোলনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ব্রিটিশ আমলে বাংলার কৃষক সমাজ ছিল জমিদার ও মহাজনী শোষণের নির্মম শিকার। কৃষকের ঘাম ঝরলেও ফসলের ন্যায্য মূল্য মিলত না। এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে কৃষক-প্রজা আন্দোলন।
১৯৩৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রজা সম্মেলনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে ময়মনসিংহ সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষক প্রজা পার্টি। এই রাজনৈতিক শক্তির মূল লক্ষ্য ছিল কৃষক, শ্রমজীবী ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা।
মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম সাহসী সংগঠক। তিনি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করেন এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার আদায়ে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কৃষক প্রজা পার্টির প্রতীক ছিল “লাঙ্গল” এবং মুসলিম লীগের প্রতীক ছিল “হারিকেন”। সে সময় বাংলার গ্রামাঞ্চলে মুখে মুখে উচ্চারিত হতো জনপ্রিয় স্লোগান—
“লাঙ্গল যার, জমি তার — ঘাম যার, দাম তার।” এই নির্বাচনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক পটুয়াখালী আসনে খাজা নাজিমউদ্দিনকে প্রায় সাত হাজার ভোটে পরাজিত করেন।
একই নির্বাচনে নড়াইল-মাগুরা আসনে মুন্সী ওয়ালীউর রহমান প্রভাবশালী জমিদার বাবু ধীরেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর এবং আলফাডাঙ্গার মোঃ আছাদুজ্জামান বাহাদুরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন এবং অবিভক্ত বাংলার এম.এল.এ নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত আইনসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যশোর জেলা বোর্ডের দূরদর্শী নেতৃত্ব ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা বোর্ডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট (বর্তমান চেয়ারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের জনজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
তাঁর উদ্যোগে বহু সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট ও নৌঘাট নির্মিত হয়। নড়াইল-সিঙ্গাশোলপুর-নওয়াপাড়া সড়ক নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে তিনি ব্যাপকভাবে নলকূপ স্থাপন করেন। একই সঙ্গে কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও চিকিৎসা সহায়তা চালু করেন। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এসব উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অসামান্য অবদান মুন্সী ওয়ালীউর রহমান বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি নড়াইল শহরে সর্বপ্রথম একটি মকতব প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে বর্তমান নড়াইল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
এছাড়াও তিনি বিভিন্ন এলাকায় দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন এবং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৪১ সালে যশোরে মাইকেল মধুসূদন কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও বাস্তবায়নেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও কারাবরণ তিনি কেবল নির্বাচনী রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ১৯৪১ সালে তাঁকে কলকাতার আলীপুর কারাগারে বন্দি থাকতে হয়।
দরিদ্র কৃষকদের মহাজনী শোষণ থেকে রক্ষার জন্য তিনি “ঋণ শালিশী বোর্ড”-এর কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। এ বিষয়ে তিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেন।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও পরিবার ১৯৪৮ সালে তিনি বৃহত্তর যশোর জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৬০ সালের ২২ জুন তিনি নড়াইল শহরের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি কৃতি সন্তান-সন্ততি রেখে যান, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
তাঁর জামাতা খন্দকার আব্দুল হাফিজ নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। অপর জামাতা সৈয়দ বদরুল আলাও যশোর অঞ্চলের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর পুত্র আশিকুর রহমান মিকু বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের উপ-মহাসচিব এবং বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। খেলাধুলায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৪ সালে জাতীয় ক্রীড়া পদকে ভূষিত হন।
ইতিহাসের পাতায় অম্লান এক নাম মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি রাজনীতিকে কখনও ব্যক্তিস্বার্থ বা ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন—রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সেবা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষা।
কৃষক-প্রজা আন্দোলনে তাঁর সাহসী ভূমিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অবদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক নেতৃত্ব তাঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সততা, মানবিকতা, আদর্শনিষ্ঠা ও জনকল্যাণভিত্তিক রাজনীতির যে শিক্ষা তিনি রেখে গেছেন, তা বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মুন্সী ওয়ালীউর রহমান কেবল একটি নাম নন; তিনি এক ইতিহাস, এক আদর্শ এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর অবদান নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম এই মহান নেতার সংগ্রামী জীবন ও কর্ম সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে পারে।
এই মহান জননেতার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তিনি বেঁচে থাকবেন ইতিহাসে, গবেষণায় এবং মানুষের হৃদয়ের গভীরে।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: [email protected]
দৈনিক ষোষণা