সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার প্রকোপ। ইন্টারনেটে বিভিন্ন অ্যাপ ও সাইটের মাধ্যমে ছড়ানো এই ‘ডিজিটাল নেশায়’ পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকরা। ঘরে বসেই লাখপতি হওয়ার প্রলোভনে পা দিয়ে কেউ নিজের ব্যবসার মূলধন হারাচ্ছেন, কেউবা বিক্রি করছেন পৈত্রিক জমি। এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে প্রশাসন ও সমাজের সচেতন মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একদল সংঘবদ্ধ চক্র সুনামগঞ্জপ ১২ টি উপজেলায় বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এজেন্ট নিয়োগ করে এই জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। মূলত স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং বেকার যুবকরাই এদের প্রধান টার্গেট। শুরুতে অল্প টাকা বিনিয়োগ করে দুই-তিন গুণ লাভের প্রলোভন দেখানো হয়। সেই ফাঁদে পড়ে একবার ডিজিটাল কয়েন কিনে বাজি ধরা শুরু করলে তৈরি হয় নেশা। লাভের চেয়ে লোকসানের পাল্লা ভারী হলেও হৃত অর্থ উদ্ধারের নেশায় চক্রে পড়ে আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে তরুণরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দোয়ারাবাজারের ও ছাতকের এক ভুক্তভোগী জানান, তার ১০ লাখ টাকার একটি সচল দোকান ছিল। অনলাইন জুয়ার লোভে পড়ে তিনি সব হারিয়ে এখন রিক্ত। নিজের পরিবারের কাছেও এখন তিনি চরম লাঞ্ছনার শিকার। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই ঘরে চুরি, মিথ্যাচার এবং সুদে টাকা ধার করার মতো পথে পা বাড়াচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের মতে, এই জুয়া মাদকের চেয়েও ভয়াবহ। মাদক কেবল শরীর ধ্বংস করে, কিন্তু অনলাইন জুয়া পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব অ্যাপের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি বন্ধুদের মাধ্যমে মুখে মুখে এর বিস্তার ঘটছে দ্রুত। এভাবে দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয়তা:- সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৮৬৭ সালের প্রচলিত ‘বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। যদিও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) নিয়মিত অনেক সাইট বন্ধ করছে, কিন্তু নতুন নতুন নামে অ্যাপগুলো আবারও বাজারে ফিরে আসছে। সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে এই আইনে ‘ডিজিটাল জুয়া’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, দেশ ও সমাজকে রক্ষায় জুয়ার মূল হোতা ও স্থানীয় এজেন্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান না করলে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তথা তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে তরুণ প্রজন্ম:-যুগোপযোগী আইন ও তার কঠোর প্রয়োগ না থাকলে আগামী দিনের নেতৃত্বদানকারী এই তরুণ সমাজ অপরাধের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাবে। জুয়ার নেশা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা, আর সেই হতাশা থেকে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও আত্মহত্যার মতো ঘটনা।
এলাকাবাসীর হুঁশিয়ারি: যদি দ্রুত এই চক্রের মূল হোতাদের সমূলে উৎপাটন করা না যায়, তবে দোয়ারাবাজারের সামাজিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এবং যুবসমাজ এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি দ্রুত অভিযান চালিয়ে এই জুয়ার এজেন্টদের মূল হোতাদের শনাক্ত করে, তবেই মানুষের এই আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। সঠিক সময়ে আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে এই অন্ধকার পথ থেকে তরুণদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে।