বরিশালে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় পরিচিত মুখ ডা. অমিতাভ সরকার। স্ট্রোক, মৃগীরোগ, মাইগ্রেন, মাথা ঘোরা, স্নায়ুব্যথা, স্মৃতিশক্তির সমস্যা, নিউরোপ্যাথিসহ বিভিন্ন নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় চিকিৎসা পরামর্শ দেন তিনি। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্ত আছেন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও প্রশিক্ষণের সঙ্গেও।
এমবিবিএস ও এমডি (নিউরোলজি) ডিগ্রিধারী এই চিকিৎসকের পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি রোগীদের কাছে তাঁর আরেকটি পরিচয়ও তৈরি হয়েছে—তিনি রোগীর কথা মন দিয়ে শোনেন এবং চিকিৎসার বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নিয়ে আসা রোগী কিংবা রোগীর স্বজনের উদ্বেগের কথাও গুরুত্ব দিয়ে শোনেন বলে জানান তাঁর কাছে চিকিৎসা নেওয়া অনেক রোগী।
মস্তিষ্ক মানবদেহের অন্যতম জটিল অঙ্গ। এর সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুতন্ত্রের কোনো সমস্যার প্রভাব পড়তে পারে মানুষের কথা বলা, চলাফেরা, স্মৃতি, অনুভূতি, দৃষ্টিশক্তি কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপনে। এ কারণে নিউরোলজিক্যাল সমস্যার ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গ ও রোগের ইতিহাস জানা, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. অমিতাভ সরকারের চিকিৎসা-চর্চায় এসব বিষয়ই গুরুত্ব পায়। স্ট্রোক, মৃগীরোগ, মাইগ্রেন, পারকিনসন্স ডিজিজ, নিউরোপ্যাথি, মাথা ঘোরা ও ভার্টিগো, স্নায়ুবিক ব্যথা, স্নায়ু প্রদাহ, মাংসপেশির দুর্বলতা এবং স্মৃতিশক্তির বিভিন্ন সমস্যায় রোগীরা তাঁর পরামর্শ নেন। স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা, কোমর ও ঘাড়ের স্নায়ুব্যথা এবং স্নায়ুর আঘাত-পরবর্তী সমস্যার ক্ষেত্রেও তিনি চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
নিউরোলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি অবস্থা স্ট্রোক। হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া কিংবা হঠাৎ ভারসাম্য হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নেওয়া জরুরি। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা গেলে জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে স্ট্রোকের চিকিৎসা শুধু জরুরি সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক রোগী চিকিৎসার পরও শারীরিক দুর্বলতা, কথা বলার সমস্যা, স্মৃতির পরিবর্তন কিংবা চলাফেরায় অসুবিধায় ভোগেন। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিয়মিত ফলোআপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও চিকিৎসা ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব, অস্বাভাবিক কাঁপুনি, খিঁচুনি কিংবা স্মৃতিশক্তির পরিবর্তনের মতো উপসর্গও অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই উপসর্গের ধরন ও রোগীর ইতিহাস বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ডা. অমিতাভ সরকারের কাছে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা। তাঁদের ভাষ্য, তিনি রোগীর কথা শোনার জন্য সময় দেন, সমস্যার বিস্তারিত জানতে চান এবং চিকিৎসার বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
মো. আইউব আলী তাঁদেরই একজন। চিকিৎসা নিতে এসে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি চিকিৎসকের আচরণের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, “আমার অনেক সমস্যা ছিল। অমিতাভ সরকার স্যারের চিকিৎসা নিয়ে ভালো আছি। আবার দেখা করতে এসেছি। ওনার কথা, আচার-ব্যবহার খুব ভালো।”
একজন রোগীর কাছে চিকিৎসকের এই আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চিকিৎসকের প্রতি আস্থা শুধু চিকিৎসার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসার বিষয়টি বুঝিয়ে বলা—এসবও চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুরোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক চাপও থাকতে পারে। রোগের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা পরিবারের ওপর প্রভাব—এসব নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ বোঝার বিষয়টিও চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ডা. অমিতাভ সরকারের পেশাগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শিক্ষকতা। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তিনি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরিতে তাঁর এই ভূমিকা রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে নিউরোলজির মতো জটিল ও দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্রে নতুন গবেষণা, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি এবং চিকিৎসার ধরন সম্পর্কে চিকিৎসকদের নিয়মিত জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন হয়। রোগীর জন্য কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, কোন চিকিৎসা উপযোগী এবং কখন বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন—এসব সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসচেতনতার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান থেকে বিরত থাকা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা স্ট্রোকসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
একজন চিকিৎসকের পেশাগত সাফল্য পরিমাপের অনেক মানদণ্ড রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চিকিৎসা দক্ষতা, গবেষণা কিংবা কর্মক্ষেত্রে অবদান—সবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে রোগীর আস্থা এমন একটি অর্জন, যা কোনো সনদে লেখা থাকে না।
কোনো রোগী চিকিৎসা নিয়ে আবার একই চিকিৎসকের কাছে ফিরে আসেন। পরিবারের অন্য সদস্যকে নিয়ে আসেন। কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অন্য কাউকে সেই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিতে বলেন—এসবই চিকিৎসকের প্রতি মানুষের আস্থার প্রকাশ।
ডা. অমিতাভ সরকারের ক্ষেত্রেও রোগীদের কথায় সেই আস্থার প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর পেশাগত পরিচয় একজন নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসা তাঁর কাজের বড় অংশ। তবে রোগীদের অভিজ্ঞতায় তাঁর আরেকটি পরিচয়ও সামনে আসে—তিনি এমন একজন চিকিৎসক, যিনি রোগীর কথা শোনার চেষ্টা করেন এবং অসুস্থতার পাশাপাশি রোগীর উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান একজন চিকিৎসককে দক্ষ করে তোলে। আর মানুষের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা তাঁকে মানবিক করে তোলে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয় চিকিৎসক-রোগীর সেই সম্পর্ক, যার ভিত্তি শুধু চিকিৎসা নয়—আস্থা।
বরিশালের চিকিৎসাঙ্গনে ডা. অমিতাভ সরকারের পথচলার গল্প তাই কেবল একজন নিউরোলজি বিশেষজ্ঞের পেশাগত পরিচয়ের গল্প নয়। এটি একজন চিকিৎসককে ঘিরে রোগীদের আস্থা তৈরির গল্প—যেখানে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দায়িত্ববোধ, আর প্রেসক্রিপশনের পাশে জায়গা করে নিয়েছে কিছু আন্তরিক কথা।
কারণ অসুস্থ মানুষের কাছে ভালো চিকিৎসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন এমন একজন চিকিৎসক—যাঁর সামনে নিজের কষ্টের কথাগুলো নির্ভয়ে বলা যায়।