এক বিস্ফোরণে আনোয়ারের মৃত্যু, সংকটে খোকনের চিকিৎসা; নিরাপত্তা ও দায়িত্ব নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানাধীন আলীশানগর বন্দরটিলা কাঁচাবাজারের পেছনে অবস্থিত ছয়তলা ‘মির্জা ম্যানসন’ ভবনের নিচতলায় বিস্ফোরণের ঘটনায় ঝালমুড়ি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন (৪৫) মারা গেছেন। গুরুতর আহত খোকন মিয়া এখনো চিকিৎসাধীন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গ্যাস লিকেজ থেকে এ বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে ঘটনার পর ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
গত ৭ জুলাই দুপুরে ঘটে এ বিস্ফোরণ। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনার দিন টানা বর্ষণের কারণে ভবনের নিচতলায় পানি জমে ছিল। ওই অবস্থায় হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। শব্দের তীব্রতায় আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিস্ফোরণের পর দগ্ধ অবস্থায় আনোয়ার হোসেনকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় আহত খোকন মিয়ার অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে তার পরিবার। তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর থেকে চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সব খরচ নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে।
খোকন মিয়ার পরিবারের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর ভবন সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে তাদের যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। আহতদের চিকিৎসা বা সহযোগিতার বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগও তারা দেখতে পাননি বলে দাবি করেন তারা।
নিহত আনোয়ার হোসেনের ভাই দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই। কোনো অবহেলা বা গাফিলতি থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও সামনে আসা প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিস্ফোরণের উৎস এখনো নিশ্চিত নয়। নিচতলার ওই কক্ষটির ব্যবহার কী ছিল, সেখানে গ্যাস সংযোগের অবস্থা কেমন ছিল, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান ছিল কি না এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা ছবি, ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের তীব্রতায় নিচতলার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি ফার্মেসির পেছনের অংশ ভেঙে যায় এবং একটি লোহার শাটার ছিটকে পড়ে। তবে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিত হয়নি।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বিস্ফোরণের সময় নিচতলায় থাকা এক নারীর বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তার পরিচয়, বর্তমান অবস্থা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার বিষয়ে ভবনের ইনচার্জ হিসেবে পরিচিত পলাশ বলেন, “বিস্ফোরণ কী কারণে হয়েছে, তা এখনো জানতে পারিনি।”
বন্দরটিলার বিস্ফোরণ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ১৩ জুলাই বিকেল ৪টা ২ মিনিটে ইপিজেড থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আতিকুর রহমান হোয়াটসঅ্যাপ কলে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।
ওসি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, “এখানে রহস্যজনক কিছু দেখছি না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস লিকেজ থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।”
তিনি বলেন, গ্যাস জমে থাকার পর আগুন ধরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। এ ঘটনায় একজন মারা গেছেন এবং আরও দুইজন আহত হয়েছেন।
ওসি আরও বলেন, “পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর অন্য কোনো কারণ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।”
তিনি জানান, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে গ্যাস লিকেজের কারণ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঘটনাস্থলের আলামত—সবকিছু কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বন্দরটিলার মির্জা ম্যানসনের বিস্ফোরণ এখন শুধু একটি দুর্ঘটনার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের শোক, আহত মানুষের চিকিৎসার সংগ্রাম এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্ন।
নিহত আনোয়ারের পরিবার, আহত খোকন মিয়া এবং স্থানীয়দের দাবি—ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত উদ্ঘাটন করা হোক। কোনো অবহেলা বা গাফিলতি থাকলে তা তদন্তে উঠে আসুক এবং ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায়বিচার পান।