লালমনিরহাটের পাটগ্রামে সালিশ বৈঠককে কেন্দ্র করে ফিরোজ হোসেন (২১) নামে এক যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য ও বিতর্ক। পরিবারের দাবি, সালিশের সিদ্ধান্ত না মানায় দুই দফা মারধরের শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, একই পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা নথিভুক্ত করেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
নিহত ফিরোজ হোসেন (২১)পাটগ্রাম পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত দিনার হোসেনের ছেলে।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত শনিবার (১ আগস্ট) একটি সালিশ বৈঠকে ফিরোজকে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়। তিনি জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সেখানে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা পর কয়েকজন ব্যক্তি তার বাড়িতে গিয়ে আবারও হামলা চালান বলে পরিবারের দাবি। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৩ আগস্ট) তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর সোমবার সন্ধ্যায় স্বজন ও এলাকাবাসী মরদেহ নিয়ে ঢাকা-বুড়িমারী মহাসড়কের আন্তঃজেলা মোড়ে অবস্থান নেন। প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে তারা হত্যাকাণ্ডের বিচার, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং হত্যা মামলা গ্রহণের দাবি জানান। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
মানববন্ধনে নিহতের বড় ভাই ফেরদৌস হোসেন অভিযোগ করেন, সালিশের নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি ফিরোজকে প্রথমে সালিশে এবং পরে বাড়িতে গিয়ে মারধর করেন। সেই হামলার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, থানায় হত্যা মামলা করতে গেলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি।
তবে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় রাতে। ফেরদৌস হোসেনই থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, মারধরের ঘটনায় অপমানিত হয়ে ফিরোজ কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেছেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা নথিভুক্ত করে।
এই দুই অবস্থানের কারণে ঘটনাটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, পরিবারের সদস্যরা প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ করলেও পরে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে ফেরদৌস হোসেন বলেন, “আমি হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। পরে অভিযোগপত্রে বিষপানের বিষয়টি উল্লেখ করার পর সেটি গ্রহণ করা হয়। আমার ভাইকে মারধরের কারণেই প্রাণ হারাতে হয়েছে।”
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা ঘটনার পর থেকে এলাকায় নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, সোমবার রাতে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মহত্যার অভিযোগে একটি লিখিত আবেদন পাওয়া গেছে, যা রেকর্ড করা হয়েছে। ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা তদন্ত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কীটনাশক পানের কোনো প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি দেননি।