মাদারীপুর জেলার পাঁচটি থানার বিভিন্ন এলাকায় খাস জমি নিয়ে বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে খাস জমির বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত জটিলতার কার্যকর সমাধান না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মারামারি, হানাহানি ও মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে আদালত ও প্রশাসনিক দপ্তরে মামলা-মোকদ্দমার চাপ বাড়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০১৬-১৭ সাল থেকে বিভিন্ন আবেদন ও প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে খাস জমির বন্দোবস্ত কার্যক্রম চূড়ান্ত করা হয়নি। ফলে একই জমি নিয়ে একাধিক পক্ষের দাবি, দখল ও বিরোধ তৈরি হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এসব বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে সংঘর্ষ এবং আদালতে মামলা পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৯৫০-এর ৭৬ ধারা অনুযায়ী, আইনের আওতায় সরকারের নিকট ন্যস্ত জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সরকার প্রণীত বিধি অনুযায়ী ওই জমি বন্দোবস্ত বা অন্যভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে পারে। অর্থাৎ খাস জমি ব্যক্তির ইচ্ছেমতো দখল বা মালিকানা দাবি করার বিষয় নয়; সরকারি বিধি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করতে হয়।
কৃষি খাস জমির ক্ষেত্রে কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৭ এবং অকৃষি খাস জমির ক্ষেত্রে অকৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫ প্রযোজ্য। সরকারি ভূমি অফিসের নাগরিক সেবা তথ্যেও এ দুই নীতিমালাকে খাস জমি বন্দোবস্তের সংশ্লিষ্ট বিধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাস জমি বন্দোবস্তের প্রস্তাব উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে জেলা কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটির কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে। অন্যদিকে অকৃষি খাস জমির ক্ষেত্রে আবেদন যাচাই ও প্রস্তাব তৈরির পর তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের পর্যায়ে যায় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো জমি দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্তের অপেক্ষায় থাকলে সেখানে দখল, সীমানা নির্ধারণ, রেকর্ড ও ব্যবহার নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পক্ষগুলো নিজেদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন কাগজপত্র উপস্থাপন করে। একপর্যায়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন নির্দেশিকাতেও জমির ক্ষেত্রে সরকারি স্বার্থ, খাস জমি, দখল, সর্বশেষ রেকর্ড এবং দেওয়ানি মামলা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফলে খাস জমির ক্ষেত্রে প্রকৃত সরকারি জমি চিহ্নিতকরণ, দখল যাচাই, রেকর্ড পরীক্ষা, যোগ্য বন্দোবস্তপ্রার্থী নির্ধারণ এবং বন্দোবস্তের সিদ্ধান্ত দ্রুত সম্পন্ন করা না হলে বিরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা খাস জমির বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত আবেদন ও নথিগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোন জমি প্রকৃতপক্ষে খাস, কোন জমিতে মামলা রয়েছে, কোন জমি দখলে রয়েছে এবং কোন আবেদনকারী সরকারি নীতিমালার আওতায় বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্য—এসব বিষয়ে পৃথকভাবে তদন্ত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
একই সঙ্গে যেসব জমি নিয়ে ইতোমধ্যে বিরোধ বা মামলা রয়েছে, সেগুলোর তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সকল ভুক্তভোগীদের প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের অধীনে জেলার পাঁচটি থানার বিভিন্ন এলাকায় খাস জমি-সংক্রান্ত পুরোনো আবেদন, বন্দোবস্ত প্রস্তাব ও বিরোধের তালিকা তৈরি করে জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান, শ্রেণি, বর্তমান দখল, মামলা-মোকদ্দমা এবং বন্দোবস্তের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সেবা কাঠামোতেও খাস জমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালনা এবং ভূমির মালিকানা ও দাগের ইতিবৃত্ত অনলাইনে সহজলভ্য করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত ফাইলগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রকৃত ভূমিহীন ও যোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার, অবৈধ দখল শনাক্তকরণ এবং বিরোধপূর্ণ জমির ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমতে পারে।
অন্যথায় দীর্ঘদিনের এসব জটিলতা ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক বিরোধ, সংঘর্ষ এবং মামলা-মোকদ্দমার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাই সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্তে দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
তবে ২০১৬-১৭ সাল থেকে মাদারীপুরের পাঁচটি থানায় ঠিক কতটি খাস জমির বন্দোবস্ত আবেদন ঝুলে আছে, কতটি মামলা হয়েছে এবং কতজন ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এসব তথ্য সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।