নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে যখন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এসে যুক্ত হয়, তখন বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে এক একটি যুদ্ধ। এমনই এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার ৭নং বিজোড়া ইউনিয়নের যুগিহারী গ্রামের সাইফুল ইসলামের পরিবার। এই পরিবারের চার সদস্যের সকলেই কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার। চরম অভাবের তাড়না আর শারীরিক অক্ষমতায় পরিবারটির দিন কাটছে অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চার সদস্যের এই প্রতিবন্ধী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সাইফুল ইসলাম নিজেই একজন আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। চোখে কম দেখার কারণে মাঠে-ঘাটে বা কোনো গৃহস্থের বাড়িতে চাইলেও তিনি ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। চোখে ভালো না দেখায় কাজে ভুল হতে পারে—এই আশঙ্কায় স্থানীয় কোনো গৃহস্থ বা নিয়োগকর্তা তাকে কাজে নিতে চান না। ফলে চার সদস্যের পুরো পরিবারের অন্ন সংস্থানের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন হাট-বাজার ও মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সাহায্য চাওয়া বা ভিক্ষাবৃত্তি।
প্রকৃতির নিষ্ঠুর পরিহাস ও অন্ধকারের সংসার
সাইফুলের স্ত্রী লাভলী খাতুনও একজন সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। স্বামীর ভাঙা সংসারে আলো ছড়ানোর মতো শারীরিক সামর্থ্য প্রকৃতি তাকে দেয়নি। অন্যদিকে সাইফুলের বড় বোন ইসমত আরা একজন মানসিক প্রতিবন্ধী, যার সার্বক্ষণিক দেখভাল ও ভরণপোষণ করতে হয় এই চরম অভাবের সংসারের মধ্যেই। বুকভরা আশা নিয়ে সাইফুল ও লাভলী দম্পতির কোলে এসেছিল একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় বর্তমানে ৭ বছর বয়সী সেই একমাত্র নিষ্পাপ শিশুটির চোখেও দেখা দিয়েছে জটিল সমস্যা। টাকার অভাবে শিশুটির উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না।
২০১৭ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও জরাজীর্ণ বাসস্থান
মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলেও এই পরিবারের কপালে তাও জোটেনি। সহায়-সম্বল বলতে তাদের ছিল মাত্র একটি মাটির ঘর। কিন্তু ২০১৭ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় সেই ঘরটিরও প্রায় অর্ধেক অংশ ভেঙে মাটির সাথে মিশে যায়। নতুন করে ঘর তোলার বা মেরামত করার সামর্থ্য না থাকায় বছরের পর বছর ধরে জোড়াতালি দেওয়া সেই জরাজীর্ণ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙা ঘরেই সপরিবারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তারা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে এই জরাজীর্ণ ঘরটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ দীর্ঘ প্রতীক্ষা
নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে চরম অনিশ্চিত, সেখানে নিজের ও সাত বছরের মেয়ের চোখের চিকিৎসা করানো সাইফুলের কাছে এক অলীক স্বপ্ন। প্রতিবেশীরা নিজেদের সাধ্যমতো মাঝে মাঝে চাল-ডাল দিয়ে সাহায্য করলেও তা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। পরিবারটির বর্তমান আকুল আবেদন, সরকারের পক্ষ থেকে যেন তাদের থাকার জন্য অন্তত একটি নিরাপদ ও স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় বিজোড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো: মাসুদ রানা বলেন, “পরিবারটির অবস্থা সত্যিই অত্যন্ত শোচনীয়। তাদের এই চরম অসহায়ত্বের কথা এবং একটি স্থায়ী বাসস্থানের দাবি আমরা দ্রুতই সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ doptore পোঁছে দেব এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দেওয়ার আকুল আহ্বান:
একটি পুরো পরিবার যখন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের পাশে এসে দাঁড়ানো। অবহেলিত ও মানবেতর জীবনযাপন করা এই প্রতিবন্ধী পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং ফুটফুটে শিশুটির চোখের আলো রক্ষা করতে সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের প্রতি দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানাচ্ছে এলাকার সচেতন মহল।