সাত তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুত হয়েছিল নকশাও। সেখানে ভবনের তৃতীয় তলায় রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় ও পরিচালকের বসার কক্ষ রাখার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে একের পর এক জটিলতা, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা ও বরাদ্দ সংকটে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিকে এসে সাত তলার পরিবর্তে অনুমোদন দেওয়া হয় তিন তলা ভবনের। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় নির্মাণ হয়েছে মাত্র দুই তলা।
তবে বিপত্তি এখানেই শেষ নয়। দুই তলা ভবন নির্মাণ হলেও সেখানে নেই বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের বসার কক্ষ। ফলে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ভবনটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও প্রায় তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবন এভাবে বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের জন্য আধুনিক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ছিল সাত তলা ভবন। সে অনুযায়ী নকশা প্রস্তুত করা হয়। নকশায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের জন্য পৃথক কক্ষের পাশাপাশি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কক্ষ রাখার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই দেখা দেয় নানা জটিলতা। নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ এগিয়ে না যাওয়ায় ২০২৩ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষের দিকে এসে সাত তলার পরিবর্তে তিন তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। পরিবর্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবন নির্মাণের অনুমোদন মিললেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় শেষ পর্যন্ত তিন তলাও নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।
ফলে সাত তলা ভবনের জন্য তৈরি করা ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মাণ করা হয় মাত্র দুই তলা। অর্থাৎ প্রাথমিক পরিকল্পনার সাত তলা থেকে অনুমোদিত তিন তলা, আর বাস্তবে নির্মাণ হয়েছে দুই তলা ভবন।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর নতুন করে সামনে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। প্রাথমিক নকশায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের জন্য কক্ষ রাখার পরিকল্পনা থাকলেও দুই তলা ভবনে সেই কক্ষ নেই। ফলে ভবনটি নির্মিত হলেও তা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার উপযোগী হয়নি। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর থেকেই ভবনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ভবন পড়ে আছে তালাবদ্ধ। অন্যদিকে ওই কার্যালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে পুরোনো ও অন্য একটি ভবনে। বর্তমানে বিভাগীয় মেডিক্যাল সাব ডিপোর ভবনে বসেই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।ভবন নির্মাণের বিষয়ে ঠিকাদারের প্রতিনিধি রওশন কামাল তারেক বলেন, ভবন নির্মাণের সময় যে নকশা ও অনুমোদন ছিল, সে অনুযায়ীই কাজ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বরাদ্দ ও অনুমোদনের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নতুন ভবন নির্মাণ হলেও নকশা তাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় পরিচালকের বসার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থাকার কথা ছিল। কিন্তু ভবন হয়েছে দুই তলা। ভবনটি এখনও তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী নওরোজ মো. তারেক বলেন, ভবনটি যে পরিকল্পনা ও অনুমোদন পাওয়া গিয়েছিল, সে অনুযায়ীই নির্মাণ করা হয়েছে। বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি কোনো কার্যালয়ের জন্য ভবন নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রয়োজনীয় কক্ষ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা, দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পরিকল্পনা, নকশা ও বরাদ্দের মধ্যে থাকতে হয় কার্যকর সমন্বয়।
কিন্তু রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের নতুন ভবনের ক্ষেত্রে সেই সমন্বয়ের ঘাটতিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাত তলা ভবনের পরিকল্পনা ও নকশা থেকে কমে অনুমোদন হয়েছে তিন তলা, শেষ পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে দুই তলা। আবার নির্মিত ভবনেও নেই কার্যালয়ের প্রধানের বসার কক্ষ। ফলে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকা শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্পের সীমাবদ্ধতাই নয়, বরং সরকারি অর্থ ব্যয় ও প্রকল্প পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়েও তৈরি করছে বড় প্রশ্ন।