টানা বৃস্টিতে জোয়ারের পানি বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হওয়ায় ভোলার বিভিন্ন রুটের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, দূর্ভোগে হাজারো মানুষ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাব ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উপকূলীয় জেলা ভোলার ছয়টি অভ্যন্তরীণ নৌরুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এদিকে জেলার মনপুরা ও তজুমদ্দিনের কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ও থেমে থেমে হালকা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে মেঘনা নদীতে ঢেউয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নদীপথে ছোট নৌযান চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে।
ভোলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫৩ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। লঘুচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি জানান।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান বলেন, সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে তজুমদ্দিন ও মনপুরা উপজেলার মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। এদিকে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল থাকায় ভোলা-মনপুরা, ভোলা-হাকিমুদ্দিনসহ জেলার ছয়টি অভ্যন্তরীণ নৌরুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সরেজমিনে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উপজেলার মনপুরা ইউনিয়ন, দক্ষিণ সাকুচিয়া, উত্তর সাকুচিয়া ও হাজিরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট, কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে থাকতে দেখা গেছে। নিচু এলাকার অনেক জমিতে কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। সদ্য রোপণ করা আমনের চারা কোথাও কোথাও পানির নিচে তলিয়ে আছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত আদ্রতায় হলদে হয়ে পড়েছে।
মনপুরা ইউনিয়নের কৃষক মো.আমির হোসেন, জামাল ও আলী আহাম্মদ বলেন, মনপুরা একটি উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার প্রভাব সরাসরি এখানকার ঘরবাড়ি ও কৃষিতে পড়ে। বর্ষায় অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, ফলে মানুষের চলাফেরা ও কৃষি উৎপাদন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের কৃষক মো আব্দুল কাদের, সাহাবউদ্দিন এবং উত্তর সাকুচিয়ার এলাকার কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, একদিকে জলাবদ্ধতায় প্রভাব পড়ে এখানকার কৃষির ওপর, অন্যদিকে মানুষের ঘরবাড়ি ও চলাফেরায় শঙ্কা। অপরদিকে কৃষির উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিÑসব মিলিয়ে কৃষি করে টিকে থাকা তাদের জন্য এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আশরাফ হোসেন বলেন, অতি বৃষ্টির কারণে দক্ষিণ সাকুচিয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার খবর পেয়েছি। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকার কেউ যেন পানি নিষ্কাশনে খালে বাঁধ না দেয়, সেদিকে এলাকার সচেতন মহল নজর রাখতে হবে। যদি খালে বাঁধ না থাকে তাহলে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে নেমে যেতে পারে। ফলে কৃষকের বীজ তলা ক্ষতি থেকে বাঁচবে।
বিআইডব্লিউটিএ’র ভোলা নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নৌরুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ভোলার ইলিশা-লক্ষ্মীপুর-ঢাকা নৌপথে ফেরি ও যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে মৎস্য খাতেও। বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন নদী এলাকায় জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত রয়েছেন। একই সঙ্গে নদীতে জেলে নৌকা ও অন্যান্য ছোট নৌযানের চলাচলও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান গণমাধ্যমকে জানান, দুর্যোগের সার্বিক খোঁজখবর রাখতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পরিস্থিতির ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নদীপথ ব্যবহারকারী যাত্রী ও নৌযান সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।