মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”—এই মানবিক দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে সমাজের অনেক তরুণ আজ স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন। তাঁদেরই একজন সখীপুর উপজেলার মানবিক তরুণ মো. আব্দুল্লাহ আল কাফি। তিনি এ পর্যন্ত ৩১তমবার স্বেচ্ছায় রক্তদান করে মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য সময়মতো রক্তের ব্যবস্থা হওয়া অনেক ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিরাপদ রক্তের বিকল্প নেই। এমন সংকটময় মুহূর্তে একজন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার একটি ব্যাগ রক্ত একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সখীপুর ব্লাড ডোনেশন ক্লাবের বর্তমান সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল কাফি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রোগীদের রক্ত দিয়ে আসছেন। পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মানবসেবাকে নিজের জীবনের অন্যতম অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোথাও কোনো রোগীর রক্তের প্রয়োজনের খবর পেলেই তিনি দ্রুত হাসপাতালে বা ক্লিনিকে ছুটে যান। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক তরুণও নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে এসেছেন।
আব্দুল্লাহ আল কাফি বলেন, “একজন মানুষ হিসেবে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো আমার নৈতিক দায়িত্ব। ২০১৫ সালে প্রথম একজন রোগীকে রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে আমার রক্তদান শুরু হয়। প্রথমবার রক্ত দেওয়ার পর যখন দেখলাম একজন মুমূর্ষু রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তখন যে আত্মতৃপ্তি ও আনন্দ অনুভব করেছি, সেটিই আমাকে নিয়মিত রক্তদানে অনুপ্রাণিত করেছে। মহান আল্লাহ আমাকে যতদিন সুস্থ রাখবেন, ইনশাআল্লাহ ততদিন মানুষের প্রয়োজনে রক্তদান করে যাব। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন ভবিষ্যতেও মানবসেবার এই কাজ অব্যাহত রাখতে পারি।”
রক্তগ্রহীতার স্বামী মোহাম্মদ মোহন মিয়া বলেন, “আমার স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের কাছে অনেক চেষ্টা করেও রক্তের ব্যবস্থা করতে পারিনি। পরে আব্দুল্লাহ আল কাফি ভাই স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেন। তাঁর এই উপকার আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।”
স্থানীয় তরুণ আব্দুস সামাদ বলেন, “আমার অসুস্থ দাদির জন্য কাফি ভাই রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁর এই মানবিকতা আমাদের মতো অনেক তরুণকে রক্তদানে উৎসাহিত করেছে। মানুষের সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারাটা সত্যিই গর্বের বিষয়।”
আরেক রক্তগ্রহীতার স্বামী শান্ত মোহাম্মদ বলেন, “আমার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় কাফি ভাই রক্ত দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।”
সখীপুর ব্লাড ডোনেশন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ওবায়দুল হক শাওন বলেন, “২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমাদের ক্লাবের সদস্যরা নিয়মিত বিনামূল্যে রোগীদের রক্ত দিয়ে আসছেন। বর্তমান সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল কাফি ইতোমধ্যে ৩১ বার রক্তদান করেছেন। এছাড়াও ক্লাবের অন্যান্য সদস্যরাও নিয়মিত মানবসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।”
মডার্ন ডক্টরস ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “আব্দুল্লাহ আল কাফির মতো স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা সমাজের প্রকৃত মানবসেবক। তাঁদের স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে অসংখ্য রোগী নতুন জীবন ফিরে পান। নিয়মিত রক্তদাতারা মানবতার একেকজন উজ্জ্বল উদাহরণ।”
সখীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সিকদার মোহাম্মদ ছবুর রেজা বলেন, “দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার, কিডনি ও থ্যালাসেমিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষের সংকটময় সময়ে যারা স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে পাশে দাঁড়ান, তারা সমাজের প্রকৃত মানবিক মানুষ। আব্দুল্লাহ আল কাফিসহ সকল স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা জানাই। তাঁদের এই মানবিক অবদান মানুষের হৃদয়ে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”