নদী তো জীবিকার পথ। কিন্তু সেই নদীই যখন হয়ে ওঠে ভয়ের করিডর, তখন শুধু নৌকা নয় ডুবে যেতে থাকে মানুষের স্বপ্নও। যাদুকাটা, রক্তি ও পাটলাই নদীর ঢেউ আজ আর কেবল বালি-পাথর বহন করে না বহন করে নৌ-শ্রমিকের কান্না, মাঝির আতঙ্ক আর ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি টোলের আড়ালে চলছে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য যেখানে আইনের ভাষার চেয়ে লাঠির ভাষাই বেশি কার্যকর।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা, রক্তি ও পাটলাই নদীতে বিআইডব্লিউটিএ ইজারাদারের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টোল আদায়, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, নৌ-শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন এবং সন্ত্রাসী কায়দায় চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন ‘যাদুকাটা নদী নৌকা মালিক সমিতি’ ও ‘স্টোন ক্রাসার মালিক সমিতি’র নেতারা।
বুধবার (২ জুলাই) দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, তাহিরপুরের ফাজিলপুর এলাকায় একই পয়েন্টে বালি-পাথরবোঝাই নৌকা থেকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন দফায় অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর নামে প্রতি ঘনফুটে ৩ টাকা, খাস কালেকশনের নামে ১ টাকা এবং ফাজিলপুর টোল ট্যাক্সের নামে আরও ১ টাকা ৩০ পয়সা মোট ৫ টাকা ৩০ পয়সা আদায় করা হচ্ছে।
এতেই শেষ নয়। শ্রীপুর ডাম্প বাজারসংলগ্ন পাটলাই নদীতেও সরকারি নির্ধারিত টোলের বাইরে ‘কূটাগাড়ি’ নামে প্রতি ঘনফুটে অতিরিক্ত ২ টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। অথচ কোথাও সরকারি টোল চার্ট টাঙানো নেই, নেই বৈধ রশিদের ব্যবস্থা। অভিযোগ অনুযায়ী, ইজারাদারের কর্মচারীরা নিজেদের ইচ্ছামতো হিসাব চাপিয়ে দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করছে।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালেই নৌ-শ্রমিক ও মাঝিদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। লাঠিয়াল বাহিনীর মারধরের মুখে অনেক মাঝি মাঝনদীতেই নৌকা ফেলে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে নৌকা ফেরত আনতেও গুনতে হয় মনগড়া জরিমানা। প্রশ্ন উঠেছে এ কোন আইনের শাসন, যেখানে নদীর মাঝেই বসে তৈরি হচ্ছে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা?
ব্যবসায়ী নেতারা অভিযোগ করেন, এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন শত শত নৌকায় বালি, পাথর ও কয়লা পরিবহন হয়। কিন্তু লাগামহীন চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
তাঁদের ভাষায়, "আমাদের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এভাবে প্রকাশ্য ডাকাতি চলতে থাকলে নৌকা মালিক দেউলিয়া হবে, শ্রমিক বেকার হবে, আর নদী হয়ে উঠবে আতঙ্কের আরেক নাম।"
স্মারকলিপিতে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে—সরকারি টোল চার্ট প্রকাশ্যে প্রদর্শন ও বাধ্যতামূলক পাকা রশিদ প্রদান, নৌ-শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, মাঝনদীতে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ করে নির্ধারিত বুথে টোল আদায় নিশ্চিত করা এবং নৌকা মালিক ও শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জেলা প্রশাসক স্মারকলিপি গ্রহণ করে অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। স্মারকলিপির অনুলিপি পুলিশ সুপার, নৌ পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়েছে।
সরকারি ইজারার আড়ালে অবৈধ অর্থ আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে,তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয় এটি আইনের শাসন, সুশাসন এবং মানবাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং নদীপথে স্বচ্ছ টোল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় নদীর স্রোতের সঙ্গে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও ভেসে যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক || মোঃ সাহিদুর রহমান টেপা || সহযোগী সম্পাদক || নাজনীন সুলতানা || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক || নওয়াজিস তাহনুন চন্দন || সহকারী সম্পাদক || ডা. শরিফুল হক প্রিয়ম || প্রধান নির্বাহী সম্পাদক || এস এম. জহিরুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: টেপা কমপ্লেক্স: ১৬৯/ক, এস এস নজরুল ইসলাম সারণী পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০ || বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৪৮ বিজয় নগর (৩য় তলা) ঢাকা -১০০০ || যোগাযোগ: ই-মেইল: ghoshonanews2024@gmail.com
দৈনিক ষোষণা