১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির উদ্যোগে এক মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবহেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, “এক সময় পরিবারের সবচেয়ে সম্মানিত সদস্য ছিলেন প্রবীণরা। তাদের পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা ছিল পরিবার পরিচালনার মূল ভিত্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নগরায়ণ, ভোগবাদী মানসিকতা এবং আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপনের কারণে প্রবীণরা আজ অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “প্রবীণদের শেষ ঠিকানা হিসেবে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, যা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের দুর্বলতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র। অনেক সন্তান এখন তাদের বাবা-মাকে বোঝা মনে করছে। এটি শুধু মানবিক সংকট নয়, নৈতিকতারও অবক্ষয়।”
মঞ্জুর হোসেন ঈসা আরও বলেন, “যারা সারাজীবন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন, তাদের বার্ধক্যে নিরাপত্তা, সেবা ও সম্মান নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রবীণদের প্রতি অবহেলা, মানসিক নির্যাতন, সম্পত্তির লোভে হয়রানি কিংবা শারীরিক নির্যাতন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”
তিনি সরকারের প্রতি প্রবীণবান্ধব নীতি আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনগত সহায়তা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশেও গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি একাকীত্ব, অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
বক্তারা আরও বলেন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের সমাজের বোঝা নয়, বরং সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই প্রবীণ নির্যাতনমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
মানববন্ধনে মানবাধিকার কর্মী, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, প্রবীণ নাগরিক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। কর্মসূচি থেকে প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবারভিত্তিক যত্ন নিশ্চিতকরণ এবং প্রবীণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, “আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মানবিক সমাজ নির্মাণ করা।”
মানববন্ধন শেষে প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।