নিজস্ব প্রতিবেদক
পত্রপত্রিকায় খবর বরখাস্ত হওয়া ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহমেদ ভূঁইয়া তাঁর তিন কন্যা আর স্ত্রীকে নিয়ে শুক্রবার বিকেলে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। সেখানে যাওয়ার আগে তিনি মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে ইংরেজী দৈনিক দ্যা ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন মার্কিন দূতাবাসে যাওয়ার খবর। এরপর তাঁরই বড় মেয়ে আমেরিকান এম্বেসীর বাইরে অপেক্ষমাণ অবস্থায় সেলফি তুলে সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট করলেন। এমরান কন্যার হাসিমাখা ছবি দেখেই বোঝা যায়, ওনারা ঠুনকো অজুহাতে আমেরিকায় পাড়ি জমানোর স্বপ্নে মশগুল। কিন্তু এভাবে কি মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় চাওয়ার কোনো ঘটনা এর আগে বাংলাদেশ কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ঘটেছে?
গত কয়েক বছর যাবত কিছু দুর্বৃত্ত নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার দাবী করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে সেখানে বসে বাংলাদেশ বিরোধী নানা অপকর্ম আর সাইবার সন্ত্রাসে লিপ্ত রয়েছেন। এদের কেউকেউ ফেইসবুক এবং ইউটিউবে কথিত টিভি চ্যানেল খুলে ফ্রি স্টাইলে ব্ল্যাকমেইলিং এবং চাঁদাবাজি চালিয়ে গেলেও এসব অপরাধীর বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেনা। হয়তো এসব বিবেচনায় এমরান আহমেদ ভূঁইয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভেবেছেন, চাকরী থেকে বরখাস্ত হওয়ার অজুহাতের সাথে আরো কিছু কল্পকাহিনী শুনিয়ে গোটা পরিবার নিয়ে আমেরিকায় চলে যেতে পারলে দোষ কোথায় বরং আখেরে ভালোই হবে।
এমরান আহমেদ নিজের পেশাগত জীবন নিয়ো বেশ কিছু দিন আগে থেকেই নানা কারণে নাখোশ। তিনি চেয়েছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি হতে। কিন্তু ওনার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাবসহ তার বিরুদ্ধে আরো কিছু অভিযোগের কারণেই তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি। এরই মাঝে ওনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে উঠলে এমরান আহমেদ কয়েকমাস ধরেই চাকরী ছেড়ে আইন পেশা কিংবা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। এমনকি তিনি কানাডায় পাড়ি জমানোর ইচ্ছেও পোষণ করেছিলেন। এসব খবর অনেকেরই জানা।
কে এই এমরান আহমেদ ভুঁইয়া?
অনুসন্ধানে জানা যায়, এমরান আহমেদ ভূঁইয়া পৈত্রিকসূত্রে কুমিল্লার বাসিন্দা। বাবা সুলতান আহমেদ ভূঁইয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তার মায়ের নাম সুরাইয়া সুলতানা। বাবার চাকরীর সুবাদে পরে তারা চট্টগ্রামে স্থায়ী হয়েছেন। ড. ইউনূস যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করতেন ওই সময় এমরানের বাবাও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতেন। পারিবারিকভাবে এমরানের পরিবারের সাথে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সখ্যতা ছিলো। ১৯৯২-৯৩ এমরান আহমেদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হোন।
এমরানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী ও বর্তমানে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী একাধিক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নকালে এমরান ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০০৩ সালে সে হাইকোর্টে প্র্যাকটিসের অনুমতি পান এবং ২০০৫ সালে এসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করেন। এরপর ২০১৮ সালে ৪ জানুয়ারী বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশক্রমে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ লাভ করেন।। গত কয়েক বছরে এমরান আহমেদ নিজেকে আওয়ামীলীগের একনিষ্ট কর্মী পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। ওনার এই দলীয় পরিচয়ে চোখে পড়ার মতো বাড়াবাড়ি থাকায় অনেকেই বুঝতে পারেন – এসবই ছিলো তাঁর অভিনয়।
অধ্যাপক ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নেয়ার পরই এমরান আহমেদ বুঝতে পারেন দলীয় বিবেচনায় এতোকাল যে চাকরীটা তিনি করছিলেন এবং নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিলেন এর সময় শেষ হয়ে এসেছে। কেউকেউ বলেন, চাকরী থেকে বাদ পড়ার উদ্দেশ্যেই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান অধ্যাপক ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমরানের একজন সহকর্মী বলেন, এমরানের অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজন আমেরিকায় থাকেন। এমরানও পরিবারসহ আমেরিকায় নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এখন মার্কিন দূতাবাসে অবস্থান করছেন।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যমতে, মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয়ের খোঁজে অপেক্ষায় থাকা সদ্য বরখাস্ত হওয়া ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহমেদ ভূঁইয়া পরিবারসহ বাসায় ফিরেছেন। শুক্রবার বিকেলে এমরান আহমেদ তাঁর পরিবারসহ ঢাকার বারিধারাস্থ মার্কিন দূতাবাসে অবস্থান নেয়। পরে রাত সাড়ে আটটার দিকে তিনি পরিবারসহ বাসায় ফেরেন। এসময় গুলশান থানা পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দেয়। মোহাম্মদপুরে এমরান তার পরিবারসহ বাসায় পৌছানোর পর মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ তাঁর নিরাপত্তার বিষয়ে কথা বলেছেন।
এদিকে ঢাকাস্থ মার্কির দূতাবাস হতে এমরান আহমেদ ভূঁইয়ার আশ্রয় আবেদনের বিষয়ে কোন গ্রহনযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এমরান আহমেদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি বা তার প্রানণাশের হুমকির সঠিক কোন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। যদিও সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান দাবী করছেন, তার ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার ও হোয়াটসআপে গত ৪/৫ দিন ধরে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে এমরানের নিরাপত্তা দানের দায়ভার পুলিশের। মার্কিন দূতাবাস তাকে কেন আশ্রয় দেবে? অথবা তিনি একজন আইনজীবি হিসেবে পুলিশের দারস্থ না হয়ে পরিবারসহ মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় নিতে গেলেন তাই এখন ক্ষতিয়ে দেখার বিষয়। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি আমেরিকান ভিসা লাভের জন্যই এমন স্ট্যান্টবাজি করলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া।